রাজধানীর খিলগাঁওয়ের সিপাইবাগের উত্তর গোড়ান-আদর্শনগরের ৩৫০ নম্বর একটি বাড়ির বাসিন্দা নূরে আলম। বাসায় থাকলে তিনি নিজের মোটরসাইকেলটি বাড়ির নিচে কার পার্কিংয়ে অন্য গাড়ির সঙ্গে রাখেন। ১৬ মার্চ শুক্রবার ছুটির দিনেও বাড়ির নিচেই ছিল তাঁর ডিসকভার মোটরসাইকেলটি। দুপুরে জুমার নামাজ পড়তে যান তিনি। ফিরে এসে দেখেন সেটি নেই। প্রতিবেশী এক যুবক তাঁকে জানান, লাল গেঞ্জি পরা এক যুবককে মোটরসাইকেল চালিয়ে যেতে দেখা গেছে। দ্রুত থানায় ছোটেন নূরে আলম। খিলগাঁও থানা পুলিশ এ ঘটনায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) গ্রহণ করে। আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ তল্লাশি করা হয়। এতে কোনো আলামত মেলেনি। এখানেই শেষ তদন্ত! ঘটনার ১০ দিন পর খোঁজ নিলে নূরে আলম বলেন, ‘পুলিশ তো কিছু বের করতে পারল না। এখানে প্রায়ই মোটরসাইকেল চুরি হচ্ছে।’ ঘটনার তদন্তকারী খিলগাঁও থানার উপপরিদর্শক (এসআই) বোরহান বলেন, ‘হ্যাঁ, এখানে আরো ঘটনা ঘটেছে। আমরা দেখছি কিছু বের করা যায় কি না।’

যেদিন নূরে আলমের মোটরসাইকেল চুরি হলো, সেদিন ভোরে মুগদার মানিকনগরের ৮২/৮৩ নম্বর নূর ফাতেমা ভবনে একটি বাসায় নিরাপত্তাকর্মী  মিজান ও একটি ফ্ল্যাটের গৃহকর্মী আবদুল গণিকে কুপিয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে যায় তিন দুর্বৃত্ত। দুই ঘটনার মাত্র ছয় দিন আগে গত ১০ মার্চ ভোরে খিলগাঁওয়ের উত্তর গোড়ানের ৬৬ নম্বর বাসায় কলাপসিবল গেটের তালা ভেঙে ভেতরে ঢোকে তিন চোর। সেখানেও একইভাবে তাদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হন নিরাপত্তাকর্মী মনির হোসেন।

কোনো ঘটনায় দুর্বৃত্তরা ধরা পড়েনি। হয়নি কার্যকর তদন্ত। এভাবেই একের পর এক মোটরসাইকেল চুরি বা ছিনতাই হলে সে ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়। জিডি করেই দায় এড়ায় পুলিশ। ছিনতাই হওয়া মোটরসাইকেল উদ্ধারের ঘটনাও কম। এ সুযোগে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে অপরাধীচক্র। কি দিন কি রাত—এদের দৌরাত্ম্যে রাস্তা, শপিং মল, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত চত্বর-পার্কিং—কোথাও যেন নিরাপদ নয় সাধারণ মানুষের মোটরসাইকেল। গাড়িতে তালা দিয়েও রেহাই মিলছে না। দুই মিনিটের মধ্যেই বিশেষ চাবি (গোল্ডেন কি) দিয়ে খুলে মোটরসাইকেল উধাও করে দিচ্ছে চক্রের সদস্যরা। নগরীর বিভিন্ন রাস্তায় পুলিশের বসানো সিসিটিভি ক্যামেরা থাকায় কৌশল পাল্টে সড়ক ছেড়ে এখন তাদের নজর বাসাবাড়িতে। চুরি-ডাকাতির মোক্ষম সময় হিসেবে এখন তারা বেছে নিচ্ছে ছুটির দিনগুলো। কালের কণ্ঠ, ঢাকা ৩৬০ ডিগ্রির অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীতে মোটরসাইকেল চুরি ও ছিনতাইয়ের ১৬টি চক্র সক্রিয়। রাজধানীর মিরপুর ও খিলগাঁও এলাকায়ই তারা বেশি অপকর্ম করছে। এদের প্রতিটি দলে প্রশিক্ষিত পাঁচ থেকে আটজন সদস্য আছে। আগে কয়েকটি মোটরসাইকেল চোরচক্রের সদস্য ধরা পড়লেও এখন অভিযান সিথিল হয়ে গেছে। চক্রের হোতারা জামিনে ছাড়া পেয়ে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও পুলিশ সূত্র জানায়, গত এক মাসে ঢাকায় ৫০টির বেশি মোটরসাইকেল চুরির ঘটনা ঘটেছে। চুরির সময় বাধার মুখে পড়ে হামলা চালানোর ঘটনায় এক নিরাপত্তাকর্মী নিহত ও ১২ জন আহত হয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, মোটরসাইকেল চোরচক্রের বড় হোতা শরীয়তপুরের আমিরের গ্রুপ আদালতপাড়া, গাজীপুর, মাওনায় সক্রিয়। যাত্রাবাড়ী, শাহবাগ ও সূত্রাপুর এলাকায় সক্রিয় যাত্রাবাড়ীর ‘শরীয়তপুইর্যা মেরাজ’ গ্রুপ। চিটাগং রোডের বাসিন্দা খালেক, বাড্ডার রিপন, মেরুল বাড্ডার হোন্ডা রাকিব ও রিয়াজ, নতুন বাজারের শাহ আলম, খিলগাঁওয়ের মামা খোকন, সিপাইবাগের মকবুল, সোর্স রহমান, নঈমবাগের নামাপাড়ার গরু শামীম, শনির আখড়ার জুয়েল, বনশ্রীর বরিশাইল্যা কাজল, মিরপুর ৬ নম্বর সি-ব্লকের চোরা জসিম, রামপুরা টিভি সেন্টারের পিচ্চি আল আমিন, কুঞ্জবন এলাকার কানা হিমেল ও পাগলা নগরের ফয়সাল, মিরপুর ১২ নম্বরের রনি ওরফে চিকা রইন্যা ও স্বপন, খিলগাঁও  পলাশ, মারুফ, রাসেল, পারভেজ, মিলন এবং খিলগাঁও ভূঁইয়াপাড়ার মানিক চোরচক্রের হোতা। এ ছাড়া মিরপুর গুদারাঘাট, এক নম্বর, টেকনিক্যাল, বেড়িবাঁধ, ধৌড় এলাকায় গোল্ডেন দুলাল গাড়ি ও মোটরসাইকেল চোরচক্রের গুরু সোহাগ ।সোহাগ উবার এপস এর একজন মোটর সাইকের চালক।তাকে একেক সময় একেক মোটর সাইকেল চালাতে দেখেছেন বলে কেরানিগঞ্জ এলাকাবাসি জানান।

 

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য মতে, ২০১৭ সালের শেষ তিন মাসে রাজধানীতে মোটরসাইকেল চুরির ঘটনা ঘটে ৭৮টি। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে সারা দেশে মোটরসাইকেল চুরির ঘটনায় ২৯২টি মামলা হয়। একই সময়ে পুরনো ঘটনায় উদ্ধার হয়েছে মাত্র ১৩৫টি মোটরসাইকেল। মামলা না হওয়ায় ঘটনাগুলো পুলিশের এই তথ্যের বাইরে রয়েছে।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এক কর্মকর্তা বলেন, ‘মোটরসাইকেল চুরির ঘটনায় মামলা না হওয়ায় গাড়ি উদ্ধারে ডিবি কাজ করলেও এ ব্যাপারে তৎপরতা কম।’ তিনি আরো জানান, ‘মোটরসাইকেল চোরচক্রের একেক সদস্যের থাকে একেক দায়িত্ব। একজন মোটরসাইকেল মালিকের চলাচল সম্পর্কে খোঁজ রাখে। একজন কোথায় সাইকেলটি রাখা হয়, তার খোঁজ নেয়। তৃতীয়জন চুরি করার পর সাইকেলটি কোন রাস্তা দিয়ে নিরাপদে চালিয়ে নেওয়া যায় তা ঠিক করে। এভাবে রেকি করার পর দিনক্ষণ ঠিক করে দলের সবাই রাস্তা বা গ্যারেজে রাখা মোটরসাইকেলের তালা ভেঙে চুরি করে। চৌর্যবৃত্তিতে বিশেষ প্রশিক্ষিত এসব সদস্যের আছে গ্যারেজের তালা ভাঙার বিশেষ যন্ত্র। মোটরসাইকেল চুরি ঠেকাতে ডিস্ক লক, পার্কিংয়ে সতর্ক হওয়া, বাইকে সিকিউরিটি অ্যালার্ম ব্যবহার, ই-মোবিলাইজার সেন্সর সিস্টেম লাগানো, কিল সুইচ—একটা এক্সট্রা লক ব্যবহার ও নিরাপদ পার্কিং নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন ওই কর্মকর্তা।