স্টাফ রিপোর্টার : ভিকারুননিসার শিক্ষিকা হাসনা হেনা মুক্তি না পেলে প্রয়োজনে তার সহকর্মীরাও অনশনে যাবেন-এমন আশ্বাস পেয়ে আন্দোলন স্থগিত করেছেন শিক্ষার্থীরা। তিন ঘন্টার অনশন ভাঙ্গে শিক্ষার্থীরা। গতকাল রোববার দুপুর পৌনে ১টার দিকে অধ্যক্ষ হাসিনা বেগমের নেতৃত্বে শিক্ষকরা এসে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরতে বলেন। এ দিকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব জানিয়েছেন, ভিকারুননিসা নিয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। এ দিকে গতকাল বিকেলে জামিন লাভ করেন শিক্ষিকা হাসনা হেনা।
নবম শ্রেণীর ছাত্রী অরিত্রি অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় প্ররোচনার অভিযোগে আটক শিক্ষক হাসনা হেনার মুক্তির দাবিতে গত চার দিন ধরে বিক্ষোভ দেখিয়ে আসছিলেন তার শিক্ষার্থীরা।
এ দিকে সকাল নয়টার দিকে তারা অনশন কর্মসূচি শুরু করে। কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া বেশির ভাগই কলেজ শাখার ছাত্রী। পাশাপাশি প্রাক্তন কয়েকজন ছাত্রীও এ আন্দোলনে অংশ নেন। আনিকা ইশরাব নামের একজন ছাত্রী বলে, সকাল আটটার দিকে তারা প্রতিষ্ঠানের ফটকে অবস্থান নেয়। হাসনা হেনার মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে।
বেলা একটার দিকে কয়েকজন শিক্ষক এসে ছাত্রীদের অনশন ভঙ্গ করার অনুরোধ জানান। শিক্ষকদের একজন জান্নাতুল ফেরদৌস শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ছাত্রীদের অভুক্ত রেখে তাঁরা খেতে পারেন না। অনশন তখনই হবে, যখন অন্য কোনো রাস্তা থাকবে না। তিনি আশা প্রকাশ করেন, গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষক হাসনা হেনা যেকোনো মুহূর্তে, যেকোনো সময় মুক্তি পাবেন। এভাবে কিছুক্ষণ বোঝানোর পর ছাত্রীরা অনশন ভাঙতে রাজি হয়। পরে তাদের পানি পান করিয়ে অনশন ভাঙান শিক্ষকেরা।
ইংরেজি বিভাগে শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদৌস শিলা বলেন, আমরাও চাই হেনা আপার মুক্তি। তিনি নির্দোষ।
এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, আমরা তার মামলা প্রত্যাহার ও সসম্মানে মুক্তি চাচ্ছি।
কাজেই তোমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, এটি আইনগত প্রক্রিয়া; এখন হার্ডলাইনে যাওয়ার বিষয় নয়, যদি প্রয়োজন হয়, তা হলে এ যৌক্তিক দাবি আদায়ের জন্য আমরাও অনশন ও আন্দোলনে যাব।
এ দিকে গতকাল রোববার দুপুরে শিক্ষিকার মুক্তির দাবি চেয়ে কলেজের শিক্ষার্থী পমি, লামিয়া, মৃত্তিকার নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দেয়।
অরিত্রি যে শ্রেণিতে পড়ত, সেই নবম শ্রেণির শ্রেণিশিক্ষক ছিলেন হাসনা হেনা। আন্দোলনের মুখে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তাকে বরখাস্ত করেছে বিদ্যালয়টির পরিচালনা পর্ষদ, তার এমপিও বাতিল করেছে মন্ত্রণালয়।
হাসনা হেনার পাশাপাশি ভিকারুননিসার অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস ও প্রভাতি শাখার প্রধান জিনাত আখতারও বরখাস্ত হয়েছেন। অরিত্রির বাবা দিলীপ অধিকারীর মামলায় তারাও আসামি।
অরিত্রি গত সোমবার আত্মহত্যা করার পর থেকে উত্তেজনা চলছে রাজধানীর নামি এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
অভিযোগ উঠেছে-পরীক্ষার সময় অরিত্রির কাছে মোবাইল ফোন পাওয়ার পর তার বাবা-মাকে ডেকে নিয়ে অপমান করেছিলেন অধ্যক্ষ। সে কারণে ওই কিশোরী আত্মহত্যা করেছে। তবে স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি, অরিত্রি রোববার বার্ষিক পরীক্ষায় মোবাইল ফোনে নকলসহ ধরা পড়েছিল।
ভিকারুননিসা নিয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার: ছাত্রীর আত্মহত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ নিয়ে অনেকগুলো পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। সচিবালয়ে গতকাল রোববার এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন এ তথ্য জানান।
ভিকারুননিসার পাকিস্তানী আমলের নাম পরিবর্তন করা হবে কি না- সেই প্রশ্নে সচিব বলেন, আমি আপনাদের আগেই বলেছি আমরা অনেকগুলো পদক্ষেপ নেব। যতোগুলো প্রশ্ন এসেছে, যতোগুলো অভিযোগ এসেছে, ইতোমধ্যে মাননীয় আদালত একটা কমিটি করে দিয়েছেন, আমরাও কমিটি করেছি। আমরাও পরিদর্শন করব, বিভিন্নভাবে চেষ্টা করব। যেসব অভিযোগ অভিভাবকেরা করছেন, শিক্ষার্থীরা করছেন, আপনারা করছেন, সেগুলো থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আমরা এ বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি এবং আরও নিতে থাকব যাতে একটা আদর্শ প্রতিষ্ঠান হয়।
ঢাকার নামি এই স্কুলের পরিচালনা পর্ষদ কীভাবে কার্যকর থাকবে, শিক্ষকরা কীভাবে পরিচালতি হবেন, শিক্ষার্থীরা কীভাবে ভালো থাকতে পারবে, ফলাফলও ভালো হবে- সে রকম কিছু পদক্ষেপ ইতোমধ্যে নেওয়া শুরু হয়েছে বলে জানান সচিব।
রোববার সকালেও ভিকারুননিসা নিয়ে বৈঠক হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, যাতে প্রতিষ্ঠানটি ভালোভাবে চলে, শিক্ষক, অভিভাবকদের সন্তুষ্টি থাকে, যাতে শিক্ষকদের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে, শিক্ষার্থীরা প্রকৃত নাগরিক হয়ে গড়ে উঠতে পারে সেজন্য আমাদের সকল প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
প্রতিষ্ঠানটিতে প্রভাবশালীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে এক প্রশ্নে সচিব বলেন, আমি আপনাদের নিশ্চিত করে বলতে পারি আমি, আমার মন্ত্রী বা আমার বিভাগ, এমনকি মাউশি কখনও কোনো ভর্তির তদবির করেনি, চাকরি তো দূরের কথা। শিক্ষক নিয়োগ আমরা করি না, এটি একটি প্রাইভেট স্কুল, সেখানে একটা ম্যানেজিং কমিটি আছে। তারা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেন, তারাই সে কাজটি করেন। বাট এখন যে প্রমাণগুলো আসছে, ওটা নিয়ে আমরা কাজ করছি।
জামিন পেলেন হাসনা হেনা: ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় করা মামলায় শ্রেণিশিক্ষক হাসনা হেনাকে জামিন দিয়েছেন আদালত। গতকাল রোববার ঢাকার মহানগর হাকিম বাকী বিল্লাহ এই আদেশ দেন।
নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে পল্টন থানায় মামলাটি করেন অরিত্রীর বাবা দিলীপ অধিকারী। ওই মামলায় শ্রেণিশিক্ষক হাসনা হেনাকে ৫ ডিসেম্বর উত্তরা থেকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। পরদিন তাঁকে আদালতে হাজির করে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে আটক রাখার আবেদন জানায় পুলিশ। তাঁর পক্ষে জামিনের আবেদন করা হলে আদালত তা নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছিলেন। মামলাটি তদন্ত করছেন ডিবি পুলিশের পরিদর্শক কামরুল হাসান তালুকদার।
হাসনা হেনার পক্ষে জামিনের আবেদন করে আইনজীবীরা আদালতকে বলেন, শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকার আত্মহত্যার ঘটনার সঙ্গে এই শ্রেণিশিক্ষকের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আসামি হাসনা হেনা পরিস্থিতির শিকার। তাঁকে জামিন দেওয়া হলে তিনি পালাবেন না। তদন্তে বিঘ্ন সৃষ্টি করবেন না।
মামলায় অরিত্রীর বাবা দিলীপ অধিকারীর অভিযোগ করেন, পরীক্ষা চলাকালে অরিত্রী মোবাইলে নকল করেছে, এমন অভিযোগে অরিত্রীকে তার মা-বাবাকে নিয়ে স্কুলে যেতে বলা হয়। অরিত্রীর বাবা ও মা মেয়েকে নিয়ে স্কুলে যান। সেখানে ভাইস প্রিন্সিপাল তাঁদের অপমান করেন এবং কক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। সেই সঙ্গে মেয়ের টিসি (স্কুল থেকে দেওয়া ছাড়পত্র) নিয়ে যেতে বলেন। পরে প্রিন্সিপালের কক্ষে গেলে তিনিও একই রকম আচরণ করেন। এ সময় অরিত্রী দ্রুত প্রিন্সিপালের কক্ষ থেকে বের হয়ে যায়। পরে বাসায় গিয়ে দিলীপ অধিকারী দেখেন, অরিত্রী তার কক্ষে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়নায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় ঝুলছে।

সূত্রঃ সংগ্রাম।

Please follow and like us:
error