ঈদে ঘরে ফেরা মানুষের ভোগান্তি কমবে কি?

0
181

প্রতিবছর প্রিয়জনের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য দূরদুরান্ত থেকে নাড়ীর টানে শহরের মানুষেরা ঘরে ফেরে। সারা বছর কর্মব্যস্ত থাকার কারনে অনেকেরই বাড়ি ফেরা হয়না। তাই বিভিন্ন উৎসব, পার্বণে শহরের  কর্মব্যস্ত মানুষেরা বাড়ি আসার জন্য মুখিয়ে থাকে। প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার বাঙালি ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। কিন্তু পথে সীমাহীন ভোগান্তি, প্রতারণা, যানজট এবং দুর্ঘটনায় পড়ে সেই আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়।

আমাদের দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা বরাবরই নাজুক। সড়ক, রেল, জলপথ কিংবা আকাশ পথ সব পথের বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে আছে মৃত্যু ফাঁদ। ঈদ উপলক্ষে ঘরে ফেরা অতিরিক্ত মানুষের চাপ পড়ে যানবাহন গুলোতে। আর এই সুযোগে একশ্রেণির অসাধু মুনাফা লোভী ব্যবসায়ী বাতিল ও পুরনো হয়ে যাওয়া যানবাহন নুন্যতম মেরামত করে রাস্তায় নামিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। এসকল পুরনো পরিবহন হঠাৎ বিকল হয়ে পড়লে রাস্তায় সীমাহীন যানজটের পাশাপাশি অহরহ দুর্ঘটনায় শিকার হয় অসংখ্য মানুষ। ঈদে ঘরে ফেরা যাত্রীদের সর্বশান্ত করতে বিভিন্ন চক্র ওৎ পেতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এ চক্রের সঙ্গে পরিবহণ কর্মচারিদের যোগসাজশ থাকে।

ভোগান্তি বাড়তে থাকে ঘরে ফেরা মানুষের। সড়ক কর্তৃপক্ষে ঈদের আগে তড়িঘড়ি করে দায়সারাভাবে সড়ক মেরামত করে থাকে। এতে যাত্রীদের ভোগান্তি কতটা কমানো সম্ভব হয় সেটা প্রশ্ন সাপেক্ষ হলেও অর্থের অপচয় যে ঘটে, তাতে সন্দেহ নেই। খানা-খন্দকে ভরা রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে থাকতে হয়। কর্তৃপক্ষের যদি আগে থেকে ব্যবস্থা নেয় , তবে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে ঠিকঠাক মতো মেরামতের করে যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে পারে। গণ মানুষের এই ভোগান্তি শুধুমাত্র ঈদের সময় হয়না সারা বছরই কমবেশি এই ভোগান্তি পোহাতে হয় কিন্তু ঈদের সময় অসংখ্য মানুষ ঘরে ফেরে বিধায় এই ভোগান্তি মিডিয়ার চোখে পড়ে।

এখন বর্ষাকাল চলছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় কখনও গুঁড়ি গুঁড়ি ও কখনও মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। একটু ভারি বৃষ্টি হলেই রাজধানী সহ সারা দেশের বেশিরভাগ সড়ক মহাসড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। এতে সবচেয়ে দুর্ভোগে পড়বে ঈদ উপলক্ষে ঘরে ফেরা মানুষেরা। সড়ক ও মহাসড়কের গর্তগুলোতে পানি জমে যায় বিধায় গাড়ির চাকার ধীরগতি তীব্র যানজট সৃষ্টি করে। আর এই রোজার মধ্যে ঘণ্টার পড় ঘণ্টা রাস্থায় বসে থেকে ভোগান্তি যেন চরম সীমায় পৌছায়।

বিআরটিসির হিসাব মতে প্রতিদিন রাজধানী থেকে দুরপাল্লার বাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষ রাজধানী ছেড়ে যায় আর এ সংখ্যা ঈদের আগে ও পরে মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজারে গিয়ে থাকে। প্রতিদিন এ বিশাল মানুষের টিকিট কাটতে যা ভোগান্তি পোহাতে হয় তা সত্যিই দুঃখ জনক। ঈদকে কেন্দ্র করে জিনিসপত্রের দামবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যানবাহনের ভাড়া বৃদ্ধি, টিকিট কালোবাজারে চলে যাওয়ার কারনে ভোগান্তি হয় দ্বিগুণ। বিভিন্ন সময় টিকিট কালোবাজারির সঙ্গে স্থানীয় বখাটেরা জড়িত থাকে।

এইক্ষেত্রে পরিবহণ মালিক সমিতি বরাবরই নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত না নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও কার্যক্ষেত্রে তার বাস্তবায়ন দেখা যায় না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত টিকিট কাউন্টারের সামনে মানুষের লাইন ধরে দরিয়ে থেকে সীমাহীন ভোগান্তি পাহাতে হয়। টিকিট থাকা সত্ত্বেও যাত্রীদের টিকিট দেওয়া হয়না ভিআইপি কোটার কারনে। সম্প্রতি বাস লঞ্চ ট্রেনে অলিখিত ভাবে ভিআইপি টিকিট প্রথা চালু করেছে এর ফলে সাধারণ যাত্রীরা তাদের পছন্দের টিকিট কিনতে পারেনা। অনেক ক্ষেত্রে টিকিট থাকলেও কাউন্টার থেকে বলা হয় টিকিট নাই। তাই দালালদের কাছ থেকে যাত্রীরা বেশি দামে টিকিট কিনতে বাধ্য হয়।

সাম্প্রতি সড়ক পথে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারনে এবং সড়ক পথ সবসময় সংস্কারের কারণে আসন্ন ঈদে ঘরমুখো মানুষ বাসের পরিবর্তে ট্রেনের দিকেই বেশি ঝুঁকবে। ফলে বাড়বে ট্রেনের উপরে যাত্রীদের প্রচন্ড চাপ। কিন্তু চাহিদার তুলনায় বাংলাদেশ রেলওয়ের ধারণ ক্ষমতা কম। আর এ কারনেই মানুষের মধ্যে আগে ভাগে টিকিট কাটার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। প্রতিবছর ঈদের আগে ট্রেনে চলাচলকারী নিয়মিত যাত্রীরা বাড়ি ফিরতে হিমশিম খায়। হয়তো দেখা যাবে সিট সংখ্যার কয়েকগুণ মানুষ ট্রেনে চেপে বসেছে। তখন নতুন নতুন বগি সংযোজন করতে হচ্ছে। তাতেও সংকুলান না হওয়ায় লোকাল বাসের মতো বাদুরঝোলা হয়ে মানুষ ফিরবে ট্রেনে। তখন ট্রেন আর মেইল ট্রেন থাকবে না, থাকবে না আন্তঃনগর, হয়ে যাবে সব লোকাল। ভোগান্তি বাড়ে ঘরমুখো মানুষের।

সড়ক ও ট্রেন পথে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেশি এবং সব জায়গায় সড়ক ও ট্রেন পথে যাওয়া যায় না বিধায় প্রতিবছর ঈদে হাজার হাজার ঘরে ফেরা মানুষ নদী পথে লঞ্চে যাতায়াত করে। লঞ্চের কেবিনের অগ্রিম টিকিট বুকিং দিতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ে ঘরমুখো মানুষ। প্রতি বছর ঈদের আগে বাস ও ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বুকিং বিষয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিলেও লঞ্চের টিকিট বিক্রির বিষয়ে কোনো তথ্য জানা যায়না। তাছাড়া বাস ও ট্রেনের টিকিট বুকিং দিতে হলে নির্ধারিত স্ট্যান্ডে গিয়ে তা সংগ্রহ করা যায়। কিন্তু লঞ্চের টিকিট বুকিং দিতে গেলে লঞ্চে গিয়েই দিতে হয়। যাত্রীরা টার্মিনালে গিয়ে টিকিট পায়না আবার পেলেও মেলে না কাঙ্ক্ষিত কেবিন।

প্রতিবছর মানুষের ভোগান্তি যেন বেড়েই চলছে। দুঃখের বিষয় এই প্রযুক্তির যুগে এধরনের ভোগান্তি সত্যিই দুঃখজনক। আমাদের দেশে প্রায় ১১ কোটি মানুষ মোবাইল ব্যবহার করে। গণমানুষের এই টিকিট কাটার ভোগান্তি দূর করার জন্য সরকার বাস ট্রেন ও লঞ্চের টিকিট মোবাইলের মাধ্যমে ক্রয় করার ব্যবস্থা করতে পারে। এর জন্য সরকারের খুব বেশি টাকার প্রয়োজন পড়বে না শুধু মাত্র মোবাইল কোম্পানিদেরকে টিকিট বিক্রির লাইসেন্স দিলেই ঘরে ফেরা মানুষের এই ভোগান্তি দূর করা সম্ভব। মানুষ যাতে ঘরে বসেই তার কাঙ্ক্ষিত টিকিট কিনতে পারে।

আমাদের দেশে প্রতিবছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী যদি ঘরে বসে স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফরম কোন ভোগান্তি ছাড়ায় ঘরে বসে কিনতে পারে তাহলে কেন ঈদে ঘরে ফেরা মানুষ মোবাইলে এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে টিকিট কিনতে পারবে না ? কয়েক বছর আগেও এসকল শিক্ষার্থীরা দূর দূরান্ত থেকে এসে ঘণ্টার পড় ঘণ্টা লাইনে দাড়িয়ে ফরম কিনত কিন্তু এ ভোগান্তি এখন আর শিক্ষার্থীদের পোহাতে হয় না।

মোবাইল এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে টিকিট কাটার ব্যবস্থার জন্য সংশিলষ্ট কর্তৃপক্ষ বাস, ট্রেন ও লঞ্চের মালিকদের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাধ্য করতে পারে এবং এথেকে সরকার প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করতে পারে। ঈদে ঘরমুখো মানুষের হয়রানি রোধে অবিলম্বে টিকিট কালোবাজারিদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থাসহ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

কোন পরিবহনই যেন অতিরিক্ত যাত্রী বহন করতে না পারে সেজন্য প্রয়োজনে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন লঞ্চে, বাসে ও ট্রেনে গুনে গুনে যাত্রী  তুলতে পারে। যাত্রা পথে বিভিন্ন চক্র যাত্রীদের সর্বস্বান্ত করে থাকে এ ধরনের ভোগান্তি যাতে কেউ করতে না পারে, সেজন্য কর্তৃপক্ষের কঠোর নির্দেশনা যেমন থাকতে হবে, তেমনি সে নির্দেশনা প্রতিপালিত হচ্ছে কি না তারও নজরদারি করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করে, তবে এদের দৌরাত্ম বহুলাংশে রোধ করা সম্ভব। সরকার যদি কঠোর হয় এবং পরিবহণ মালিকরা যদি আন্তরিক হয় তবেই ঈদে ঘরে ফেরা মানুষের ভোগান্তি রোধ করা সম্ভব।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।

Please follow and like us: