আমাদের দেশে যারা কমবেশি রাজনীতির খবরবার্তা রাখেন। আমার ধারণা আপনারা সবাই একটি বিষয় সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। বিষয়টি হলো, ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের পূর্বে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি একটি ওয়াদা করেছিল, যদি তারা নির্বাচিত হতে পারে তা হলে, দেশ থেকে সন্ত্রাস নির্মূল করে ছাড়বে। ক্ষমতাসীন হওয়ার পরে আমরা দেশবাসী সন্ত্রাস নির্মূলের ক্ষেত্রে তাদেরকে একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখেছি। যাকে চার দলীয় জোট সরকার তাদের পাঁচ বছরের শাসনামলে সব থেকে কার্যকর এবং সফল পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য করেছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া স্বয়ং তার বয়ানে অনেক সমাবেশে, অসংখ্যবার তাদের সেই সাফল্যের ফিরিস্তি দেশবাসীকে জানিয়েছেন। শুনিয়েছেন। অর্থাৎ সন্ত্রাস নির্মূলের প্রশ্নটি ছিলো বিএনপি-র কাছে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও নির্বাচনী ওয়াদা।

অন্যদিকে আমরা প্রত্যেকেই জানি তাদের সন্ত্রাস নির্মূলের গৃহীত পদক্ষেপের সঙ্গে দেশে সংগঠিত চলমান ক্রসফায়ারের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। অর্থাৎ বিএনপি-র ঘোষিত রাজনীতি, সরকার গঠন ও ক্রসফায়ার পরস্পর সম্পর্কযুক্ত বা অবিচ্ছেদ্য একটি বিষয়। কারণ আমরা কমবেশি সবাই জানি যে, একটি দেশে সরকারের পালাবদলের পর নবগঠিত সরকারের সামনে অনেকগুলো লক্ষ্যবস্তু থাকে। তার মধ্য থেকে যে কোনো একটি লক্ষ্যকে নবগঠিত সরকার প্রাধান্য দেয়। যেমন কোনো সরকার দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, পুনর্বাসন ও জনগণের উন্নতির প্রশ্নটাকে প্রাধান্য দিতে পারে। কোনো সরকার খাদ্য উৎপাদনকে প্রাধান্য দিতে পারে। কেউবা গণশিক্ষাকে প্রাধান্য দিতে পারে। কেউবা নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিতে পারে। কোনো সরকার প্রতিরক্ষার প্রশ্নে প্রাধান্য দিতে পারে। কোনো সরকার অপর একটি দেশ দখলের বিষয়টিতে প্রাধান্য নিতে পারে। আবার কোনো সরকারের কাছে দেশের আইন শৃঙ্খলার প্রশ্নটি প্রাধান্য পেতে পারে। এভাবে একটি সরকার যে বিষয়ের উপর গুরুত্বারোপ করে বা প্রাধান্য দিয়ে থাকে, রাষ্ট্রক্ষমতা সেই প্রশ্নকে ঘিরেই প্রধানভাবে আবর্তিত হয়। ক্ষমতা কাঠামো সেই বিষয় ঘিরেই মূর্ত হয়ে ওঠে। যেমন আমাদের দেশে ২০০১ সালের নির্বাচনের পূর্বে বিএনপি-র নির্বাচনী ওয়াদা ছিলো দেশের আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়ন এবং সন্ত্রাস নির্মূল। এভাবে নির্বাচনী ওয়াদা বা অঙ্গিকার করা বরাবরই বিমূর্ত একটি বিষয়। কিন্তু সেই বিমূর্ত বিষয়টি যখন প্রয়োগে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন তাদের রাজনীতি ওই কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে মূর্ত হয়ে ওঠে। অর্থাৎ তাদের সন্ত্রাস নির্মূলের ঘোষণা ছিলো বিমূর্ত। কিন্তু পদক্ষেপ হিসেবে ক্রমফায়ারের ঘটনা মূর্ত ও নির্দিষ্ট। যা জোট সরকারের দাবি অনুযায়ী তাদের পাঁচ বছরকালের মধ্যে সবচেয়ে সফল একটি কর্মসূচী এবং স্বয়ং খালেদা জিয়া দেশবাসীকে সরকারিভাবেও তা জানিয়েছেন। ফলে তাদের সরকার, ‘রাষ্ট্রক্ষমতাকে’ সন্ত্রাস নির্মূল বা ক্রসফায়ার সংগঠিত করার ক্ষেত্রে প্রধানভাবে কাজে লাগিয়েছেÑ এটাই তাদের দাবি।

জোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর পরই সন্ত্রাস দমনে প্রথম দফায় সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে। যা আমাদের সবার কাছে অপারেশন ক্লিনহার্ট নামে পরিচিত। এতে করে দেশের সেনাবাহিনী একটি বিতর্কের মধ্যে পড়ে। নানা ধরনের প্রশ্ন ওঠে। সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে থাকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেদিন দুই ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়। প্রথমত, সন্ত্রাস দমনের পদক্ষেপ থেকে সেনাবাহিনীকে উইড্র করা। দ্বিতীয়ত, দায়মুক্তি অধ্যাদেশ জারি করা। যার সহজ অর্থ হলো সেনাবাহিনীর কোনো সদস্য যদি সত্যিকার অর্থে বিনাবিচারে কাউকে হত্যা করেও থাকে, সেই দায় থেকে রাষ্ট্র তাকে অব্যাহতি দিচ্ছে। উক্ত সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা যাবে না। মামলা করা হলেও তা খারিজ হয়ে যাবে, ধোপে টিকবে না। ঘোষণাটি স্বয়ং রাষ্ট্রের। দায়মুক্তি অধ্যাদেশের মূল কথা ছিলো এটাই।

এরপর দ্বিতীয় দফায় আমরা জোট সরকারের দলীয় সন্ত্রাসী ও ইসালামী ধারার একটি রাজনৈতিক দল বা জেএমবি-র ক্যাডারদেরকে যৌথভাবে দেশের উত্তরাঞ্চলে সন্ত্রাস নির্মূলে মাঠে নামতে দেখি। এই যৌথবাহিনীর হাতে অনেকেই খুন হন। তাদের অত্যাচারে অনেকেই চিরকালের জন্য পঙ্গু হয়ে যান। রাষ্ট্র ক্ষমতার প্রত্যক্ষ মদদেই সেটা ঘটে। পদ্ধতি হিসেবে সরকারের গৃহীত এ পদক্ষেপ (দলীয় ও সংগঠিত সন্ত্রাসীদের দিয়ে ভিন্নমতালম্বীদের খুন) সেদিন ব্যাপক সমালোচনার মধ্যে পড়ে। দেশ-বিদেশে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে থাকে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি সামনে চলে আসে। ফলে জোট সরকারকে এবারও পিছু হঠতে হয়। কারণ পদ্ধতিটি ছিলো সম্পূর্ণই আইন বহির্ভূত।

এর পর পরই তারা গ্রহণ করে তৃতীয় পদক্ষেপ, যা ইতোমধ্যে দেশ-বিদেশে ক্রসফায়ার নামে খ্যাত। এবং সেটা দেশে জরুরি অবস্থা চলাকালীন সময় বা ফকরুদ্দিনের শাসনামলেও চলমান। তবে এক্ষেত্রে একটি লক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। জোট সরকারের গৃহীত ক্রসফায়ারের পদক্ষেপ পূর্বে বর্ণিত পদক্ষেপের তুলনায় অনেকটা ব্যতিক্রমধর্মী। যেমন অপারেশন ক্লিনহার্টে অংশগ্রহণকারী সেনা সদস্যদের দায়মুক্তির প্রশ্ন ছিলো। যে কারণে রাষ্ট্রীয়ভাবে দায়মুক্তি অধ্যাদেশ জারি করতে হয়। আর দ্বিতীয় পদক্ষেপ অর্থাৎ সরাসরি রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় দলীয় ও সংগঠিত ক্যাডার বাহিনী দিয়ে ভিন্ন মতাবলম্বীদের হত্যা করা,এটা ছিলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে মানবাধিকার বা আইন লঙ্ঘনের কোনো বিষয় নাকি নেই। যদিও দাবিটা ছিলো জোট সরকারের। তা হলে, প্রশ্ন দাঁড়ায় ক্রসফায়ার কি রাষ্ট্রের আইনগত ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যেই ‘আইনি হত্যাকাণ্ড’, নাকি নাগরিকদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিনা বিচারে খুন। হ্যাঁ এটা নিয়ে বরাবরই একটা বিতর্ক রয়েছে।

আমরা সবাই জানি বিগত সরকার ক্রসফায়ার সংগঠিত করার জন্য র‌্যাব নামের আরেকটি বিশেষ বাহিনী তৈরি করেছে। তার আরেকটি ভিন্ন নাম আছে, এলিট বাহিনী। অনেকের দৃষ্টিতে আমাদের দেশে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটকারী নব্য এলিট শ্রেণীর প্রয়োজনে এই এলিট বাহিনী। দেশের আর্মস ব্যাটেলিয়ন অধ্যাদেশের অধীনে এই ফোর্স গঠন করা হয়। তার পরপরই জোট সরকার ক্রসফায়ারে নামে। অর্থাৎ ক্রসফায়ার সংঘঠনের সঙ্গে এলিট বাহিনী যেমন যুক্ত, বিএনপি-র রাজনীতিও তেমনি যুক্ত বলে অনেকে মনে করেন।

অন্যদিকে আমরা সবাই জানি জোট সরকারের পক্ষ থেকে ২১ শে জুন, ২০০৪ সালে র‌্যাব গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। ২৪ শে জুন, ২০০৪ সালে প্রথম র‌্যাবের হাতে ক্রসফায়ারের ঘটনায় একজন মারা পড়ে। তারপর থেকে ক্রসফায়ার প্রতিনিয়ত ঘটমান একটি বিষয়। যেমন ১৮ ই অক্টোবর, ২০০৪ সালে দেশের ৬৪ টি জেলায় র‌্যাব একযোগে অপারেশনে নামে। ২৬ শে অক্টোবর, ২০০৪ সালে র‌্যাব গঠনের বৈধতা নিয়ে আদালতে একটা মামলা দায়ের হয়। কিন্তু তার ফলাফল শূণ্য। কারণ তার পরপর শুধু র‌্যাবই নয়, দেশের পুলিশ বাহিনীও প্রতিযোগিতামূলকভাবে ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটাতে থাকে এবং সংখ্যাগতভাবে ক্রসফায়ারের ঘটনা বাড়তে থাকে। দেশ-বিদেশে নানামুখি প্রশ্ন ওঠে। অনেকেই ক্রসফায়ারকে বিনাবিচারে হত্যাকাণ্ড হিসাবে চিহ্নিত করেন। অনেকে এটাকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় হিসেবে দেখেন। অনেকে ক্রসফায়ারকে দেশের সংবিধানে ঘোষিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেন। অনেকেই ভাবেন র‌্যাবের জন্যও দায়মুক্তি অধ্যাদেশের অথবা ইনডেমনিটির প্রয়োজন হবে। আবার অনেকেই র‌্যাব বাহিনীর অস্তিত্ব বিলুপ্তির কথা বলেন। এভাবে র‌্যাব গঠন এবং ক্রসফায়ারের পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা চলতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে ২৯ শে অক্টোবর, ২০০৪ সালে বাংলাদেশে ক্রাইম রিপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত এক ইফতার মাহফিলে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ঘোষণা দেন, র‌্যাবের জন্য ইনডেমনিটির কোনো প্রয়োজন নেই; কারণ সন্ত্রাসীরা র‌্যাবকে আক্রমণ করলে, তখন আত্মরক্ষার তাগিদে র‌্যাবও পাল্টা গুলি করে, এতে করে সৃষ্ট ক্রসফায়ারে সন্ত্রাসীর মৃত্যু ঘটছে। ফলে আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থায় ইনডেমনিটির কোনো প্রসঙ্গ আসে না। অর্থাৎ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্যে যে বিষয়টি স্পষ্ট ছিলো তা হলো, ক্রসফায়ারে ঘটা হত্যাকাণ্ডের একটা আইনগত নায্যতা রয়েছে। তবে এখানে আমাদের আরো একটি কথা স্মরণ রাখা জরুরি যে, জোট সরকার আমলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছিলো সরাসরি প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অধীন।

ঘটনা যাই হোক না কেন, এরপর ১৩ই ডিসেম্বর ২০০৪ সালে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. রফিকুল হক ভূঁইয়া, স্বাস্থ্য ও জীবাণুবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. খায়ের আহমেদ, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. ইসমাইল হোসেন, প্রফেসর সাজেদা আক্তার, উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আজিজুর রহমান, কৃষি অর্থায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রইস উদ্দিন মিয়া, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক রেহানা আক্তার, বায়োটেকনোলজি বিভাগের প্রভাষক সাবিনা ইয়াসমিনসহ ২০৬ জন শিক্ষক এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে র‌্যাব গঠনকে স্বাগত জানায়। অর্থাৎ র‌্যাব গঠনের পক্ষে বিপক্ষে যে বিতর্ক চলছিল, ওই বিতর্কের সূত্র ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০৬ জন শিক্ষক একটি পক্ষ নেন। র‌্যাব গঠনকে তাঁরা ন্যায্য মনে করেন বা ঘুর পথে ক্রসফায়ারে হত্যাকাণ্ডের স্বীকৃতি দেন বা ক্রসফায়ারকে ন্যায্য মনে করেন।

এর কিছু কাল পরে আমরা র‌্যাবের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরেকটি ভিন্ন বিষয় লক্ষ্য করি। ২৫ শে ডিসেম্বর শনিবার, ২০০৪ সালে র‌্যাবের চট্রগ্রাম শাখা তাদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দের পরিবর্তে ‘এনকাউন্টার’ শব্দ ব্যবহার করে। প্রসঙ্গটিতে র‌্যাব চট্টগ্রামের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী এমদাদুল হক দেশবাসীকে জানান, সন্ত্রাসীরা হামলা চালালে, সেটা প্রতিরোধের অধিকার র‌্যাবেরও রয়েছে। আত্মরক্ষার্থে র‌্যাবকেও অনেক সময় গুলি চালাতে হয় এবং দুইপক্ষের মধ্যে গুলি বিনিময় কালে কোনো সন্ত্রাসীর মৃত্যু হলে তাকে এনকাউন্টার বলে। ক্রসফায়ার থেকে এনকাউন্টার শব্দটি আরো যুক্তিযুক্ত।

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, র‌্যাবের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর, তাদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে হুবহু একই ভাষায় কয়েকশত ক্রসফায়ার নামক খুনের গল্প ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। এতে করে এক পর্যায়ে তারা তাদের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে কাহিনীটা একই রেখে ‘ক্রসফায়ার’ -এর পরিবর্তে ‘লাইন অব ফায়ার’ নামে একটা টার্ম ব্যবহার করে। কিন্তু তাতেও খুব বেশি ফল দেয় না। সমালোচনা চলতেই থাকে। তার পরপরই তাদের এই এনকাউন্টার শব্দের ব্যবহার। প্রশ্ন উঠতে পারে এটা কেন? এ প্রসঙ্গে দেশের অনেক গবেষকদের মতামত হলো আমাদের উপমহাদেশের ক্ষেত্রে ‘এনকাউন্টার’ শব্দের একটি রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। যেমন আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ৭০-এর দশক জুড়ে নকশাল ধারার রাজনৈতিক কর্মীদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিনাবিচারে হত্যা করার সময় ভারত সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম রাষ্ট্রীয়ভাবে এনকাউন্টার শব্দের প্রচলন ঘটানো হয়েছিল। নেপালেও মাওবাদীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে হত্যা করার সময় একই শব্দের ব্যবহার হয়েছে। আমাদের দেশেও র‌্যাব গঠন এবং ক্রসফায়ার নিয়ে যে আলোচনা-সমালোচনা চলছিল, সেটা নিরসনেই হয়তবা লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী এমদামুল হক এনকাউন্টার শব্দটি ব্যবহার করে সুস্পষ্টতই একটি বিশেষ ইঙ্গিত দেন। অর্থাৎ কারা প্রকৃত অর্থে এনকাউন্টারের টার্গেট? যাতে করে দেশের অশান্ত বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ কিছুটা হলেও আশ্বস্ত হতে পারেন।

র‌্যাব পরিচালকের উক্ত ঘোষণার ১২ দিন পর, ৬ই জানুয়ারি ২০০৫ সালে বিএনপি-র একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব, যিনি আবার একইসঙ্গে ছিলেন তৎকালীন আইনমন্ত্রী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ নারায়ণগঞ্জে আইনজীবীদের এক সমাবেশে তাদের সরকারের পক্ষ থেকে আরো স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দেন, আমরা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি। সন্ত্রাসীদের সঙ্গে এটি র‌্যাবের যুদ্ধ। ফলে ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার ঘটনা কোনোভাবেই মানবাধিকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। অর্থাৎ শুরুতেই যে প্রশ্নটা তোলা হয়েছে, ২০০১ সালের নির্বাচনী ইস্তেহারে বিএনপি যে রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল, সান্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। আইনমন্ত্রী সেটা সেদিন আরো স্পষ্ট করে দেশবাসীকে জানিয়ে দেন। ফলে আমরা ধরে নিতে পারি। বিগত চার দলীয় জোট সরকারের ঘোষিত যুদ্ধের নাম ছিলো ক্রসফায়ার এবং সেই যুদ্ধের সৈনিক নবগঠিত র‌্যাব। এবং তাদের ঘোষিত যুদ্ধ যেহেতু তাদের রাজনৈতিক প্রোগ্রাম, সেহেতু তাদের ভাষায় সেটা মানবাধিকার লঙ্ঘন হতে পারে না। সেটা ছিলো তৎকালীন আইন মন্ত্রী ও প্রধান মন্ত্রীর ভাষ্যের মূল কথা।

ক্রসফায়ার কি তা হলে প্রচলিত আইনেরই বিশেষ একটা রূপ

আমরা যারা সংবাদপত্র ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার নিয়মিত পাঠক, শ্রোতা ও দর্শক। তারা সকলেই চলমান ক্রসফায়ারকে কেন্দ্র করে র‌্যাব- পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে একটা বিষয়ে স্পষ্ট। সেটা হলো ক্রসফায়ার মানে গ্রেফতারকৃত বন্দীকে বিনা বিচারে খুন করা। এবং এদেশের জনগণ প্রক্রিয়াটিকে বিনাবিচারে হত্যাকাণ্ডই বলে থাকেন। কিন্তু বিগত জোট সরকার তা অস্বীকার করেছে। অস্বীকার করেছে র‌্যাব-পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তাদের দাবি ছিলো ক্রসফায়ারের বিষয়টি কোনোভাবেই বেআইনি প্রক্রিয়া নয়। আমরা এ-প্রশ্নে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবরসহ তাদের সমর্থিত বুদ্ধিজীবীদের ভাষ্যেও সেটা দেখেছি। কিন্তু ক্রসফায়ার নিয়ে আলোচিত বইটির কাজ করতে গিয়ে সমাজের নানান বর্গের মানুষ অনেক মন্তব্য করেছেন। তার উপরে দাঁড়িয়ে একটা প্রশ্ন প্রথমেই উঠিয়েছি। সেটা হলো ক্রসফায়ার কি তা হলে রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর মধ্যে সংঘঠিত হত্যাকাণ্ড? যাকে সরাসরি রাষ্ট্রীয় গণহত্যা বলা চলে? ফলে বিষয়বস্তু হিসেবেই এর একটি পর্যালোচনা হওয়া দরকার।

দেশে যখন ক্রসফায়ার শুরু হয়, তখন অনেক আইনজ্ঞই নানান কিসিমের মতামত রাখেন। তার উপরে ভিত্তি করে একটি কথা স্পষ্টভাবেই বলা চলেÑ দেশের সংবিধানে যতই মানবাধিকারের ঘোষণা থাকুক না কেন। ক্ষমতাসীন সরকারগুলো চাইলেই বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং ফৌজদারি কার্যবিধির (সিআরপি) ৫৪ ও ১৬৭ ধারাকে ভিত্তি করে অনায়াসেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে দিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারে। ক্ষমতার অপব্যবহার বলতে এখানে স্পষ্টতই আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে হত্যাকাণ্ড বা খুন করা বোঝানো হচ্ছে তাদের মতে এসব ক্ষমতা সংক্রান্ত আইনের মধ্যে বিশেষ ক্ষমতা আইনটি জারি করেছিল শেখ মুজিবের আওয়ামী সরকার ১৯৭৪ সালে এবং ৫৪ ও ১৬৭ ধারা দুটি চালু করা হয় বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে। ১৮৯৮ সালে বা ১০৯ বছর পূর্বে। সম্পূর্ণই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবেই এসব আইন তৈরি করা হয়েছিল, যাতে প্রয়োজনীয় মুহূর্তে ওই আইন ব্যবহার করা যায়।

বিশেষ ক্ষমতা আইনে যে কাউকে যে কোনো সময় গ্রেফতারসহ ১ মাসের আটকাদেশ দেওয়া যায়। আবার ৫৪ ও ১৬৭ ধারায় অভিযোগ ছাড়াই পুলিশ যে কাউকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ, জোরপূর্বক (নিপীড়ন করে) স্বীকারোক্তি আদায় এবং রিমান্ডে নিতে পারে। এখন ধরা যাক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনে একটা বিশেষ তালিকা প্রস্তুত করে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে ধরিয়ে দিয়ে তাদেরকে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই খুন করার নির্দেশ দিল। এটা কি আদতেই সম্ভব? আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হ্যাঁ সম্ভব। এবং আমরা গত কয়েক বছর ধরে ক্রসফায়ার নামে তা সংঘটিত হতে দেখছি। ফলে প্রশ্ন দাঁড়ায় সেই আইনি প্রক্রিয়ার প্রায়োগীক রূপটা কেমন, সেটা নিয়ে।

আইন প্রয়োগকারি সংস্থা হিসেবে র‌্যাব-পুলিশ ওই তালিকা ধরে ৫৪ ও ১৬৭ ধারায় তাদের গ্রেফতার করল। এরপর তাদের উপরে শারীরিক নিপীড়ন চালিয়ে বেশ কিছু মার্ডার কেসের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকার তথাকথিত স্বীকৃতি আদায় করল। এমনকি তার অমুক বন্ধুর কাছে অস্ত্র রয়েছে এ-ধরনের স্বীকৃতিও। এসব স্বীকারোক্তি টিপসইসহ পুলিশ ফাইলে নথিভুক্ত করা হলো। একই সঙ্গে তাদের ওই নিপীড়নমূলক অবস্থার ভাষ্য ক্যাসেটে রেকর্ডবন্দি করা হলো। তারপর গ্রেফতারকৃতকে নিয়ে যাওয়া হলো কথিত অস্ত্র উদ্ধারে। এবং তার পরের ইতিহাস তো আমরা জানি। যাকে সরকারের পক্ষ থেকে ক্রসফায়ার বলা হচ্ছে। আর সাধারণ মানুষ বলছেন হত্যাকাণ্ড। আইন বিশেষজ্ঞদের আরো দাবি ক্রসফায়ার নামে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল (পিআরবি) নামের আইনের উপরে ভিত্তি করে। এবার সেই প্রশ্নটা একটু খতিয়ে দেখা যাক।

ক্রসফায়ারের আইনগত দিক

পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল (পিআরবি) অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেট অথবা পুলিশ সদর দফতরের পূর্বানুমতি ছাড়া এই সংস্থার সদস্যরা গুলি ছুড়তে পারে না। কিন্তু ক্ষেত্র বিশেষে তার ব্যতিক্রম রয়েছে। বিশেষ তিন ধরনের পরিস্থিতিতে পূর্বানুমতি ছাড়া তারা গুলি চালাতে পারে।

ক) মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বা যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত কোনো আসামী পালানোর চেষ্টা করলে, সেই প্রচেষ্টা রুখতে তারা গুলি চালাতে পারে।

খ) দাঙ্গা দমনকালে প্রথমে হুসিয়ারী, তারপর পর্যায়ক্রমে লাঠিচার্য, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও রাবার বুলেট ছোঁড়া; এর পরেও যদি দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন ওই দাঙ্গা রুখতে তারা গুলি চালাতে পারে।

গ) আবার বিশেষ কোনো পরিস্থিতিতে যদি কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিঘিœত হয় (ওঁৎ পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা গুলি চালালে, যা ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে তাদের বহুল আলোচিত ভাষ্য) তা হলে, সেক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বা আত্মরক্ষার স্বার্থে তারা গুলি চালাতে পারে। উপরে বর্ণিত এই তিন ধরনের পরিস্থিতিতে তারা গুলি চালালেও পরবর্তীতে পুলিশ বিভাগের নিজস্ব এক্সিকিউটিভ ইনকোয়ারিসহ বিচার বিভাগীয় তদন্ত হতে হবে। তদন্তের মাধ্যমে উক্ত বিভাগগুলো দেশবাসীকে জানাবে গুলি ছোঁড়া জাস্টিফাইড ছিলো কি না? উল্লিখিত আইনগুলোকে জনসাধারণের বোধগম্য ভাষায় উপস্থিত করে যে বিষয়টি স্পষ্ট করতে চাচ্ছি তা হলো, কিভাবে আইন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকার ইচ্ছা করলে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের নাগরিকদেরকে নির্বিচারে খুন করতে পারে। অর্থাৎ বিশেষ ক্ষমতা আইনে বা ৫৪ ধারায় যে কাউকে আটক, ১৬৭ ধারায় তথাকথিত স্বীকারোক্তি আদায়; অতঃপর অস্ত্র উদ্ধারে যাওয়া, কল্পিত ওঁৎ পেতে থাকা সন্ত্রাসীদের দ্বারা আক্রান্ত হওয়া এবং কর্তব্যরত অবস্থায় ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বা আত্মরক্ষায় পাল্টা গুলি চালানো। ফলাফল একটাই, উক্ত গুলি বিনিময়কালে শুধুমাত্র ধৃত ব্যক্তির মৃত্যু ঘটা। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তিকে আটক করা হলে, আইনই হবে তার হেফাযতকারী। তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব সম্পূর্ণই আইনের। এটাই মানবাধিকারের কথা। কিন্তু এক্ষেত্রে সেটা ঘটেনি। ধৃত ব্যক্তিকে আইন বা আইন রক্ষাকারীবাহিনী নিরাপত্তা দেয়নি। বরং বন্দী অবস্থায় হত্যাকাণ্ডকেই আইনগতভাবে জাস্টিফাইড করা হয়েছে বলে আইনজ্ঞরা মনে করেন।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে ধৃত ব্যক্তি যদি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে মারা যায় তা হলে, বিধি অনুযায়ী একটা তদন্ত হবে। তদন্তটি আবার দুটি অংশে বিভক্ত।

একটি অংশ হলো বিচার বিভাগীয় তদন্ত, যা পরিচালনা করার দায়িত্ব জেলায় ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট এবং মেট্রোপলিটন সিটিতে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট অথবা তাদের নিয়োগকৃত ম্যাজিস্ট্রেটের।

তদন্তের অপর অংশটি নির্বাহী তদন্ত, যা পরিচালনা করার দায়িত্ব পুলিশের এএসপি পদমর্যাদাসম্পন্ন একজন কর্মকর্তার। উভয় তদন্তে যদি গুলি ছোঁড়াটা জাস্টিফাইড হয় তাহলে মামলাটির আইনগত বৈধতা থাকবে না, এটাই রাষ্ট্রীয়বিধী। আর যদি তদন্তে গুলি ছোঁড়াটা জাস্টিফাইড না হয়, তাহলে ওই গুলি ছোঁড়াটা হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হবে। তখন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পরিবার বা তার আত্মীয়জন অথবা রাষ্ট্র নিজে বাদি হয়ে মামলা করতে পারে।

এখানে লক্ষণীয় যে, গত কয়েক বছর ধরে র‌্যাব-পুলিশের গুলিতে বা তাদের ভাষায় কথিত ক্রসফায়ারে যতগুলো হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, প্রতিটি মৃত্যুর ক্ষেত্রে দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩০৪ ধারায় মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হাতে গোণা ৭-৮ টি মামলা দায়ের করেছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার। বাদবাকি মৃত্যুর ক্ষেত্রে বাদী সরকার ওরফে র‌্যাব বাহিনী বা পুলিশ প্রশাসন।

দণ্ডবিধি ৩০২ ধারাটি হচ্ছে হত্যা অথবা খুনজনিত অপরাধ। আর দণ্ডবিধি ৩০৪ ধারা হচ্ছে, যদি কোনো ব্যক্তি খুন হয় বা এ-ধরনের অপরাধজনক প্রাণহানি করে অথবা কাজটিতে যদি তার মৃত্যু ঘটে, কাজটি করলে মৃত্যু হতে পারে বলে জানা থাকে, অথচ কাজটি মৃত্যু সংঘঠনের উদ্দেশে করা হয়নি, এমন অপরাধ। এই দুই ধারায় মূলত মামলা হয়েছিল।

এসব মামলার বাদী ছিলো স্বয়ং পুলিশ বা র‌্যাব। তাদের দাবি তারা খুন করেনি ঘটনাটি ছিলো ক্রসফায়ার। আবার হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটে গভীর রাতে। এবং ঘটনাস্থলে ওইসব সংস্থার সদস্য ছাড়া অন্য কারো উপস্থিতি ছিলো না। অবশ্য কোথাও কোথাও ঘটনাস্থলের আশপাশের লোকজনকে ডেকে জোর করে সাদা কাগজে সই করে নেওয়া হয়েছে, তারও অনেক তথ্য প্রমাণ রয়েছে। এতে করে মামলার ফলাফলগুলো যা হওয়া উচিৎ বলে জোট সরকার নির্ধারণ করেছিল, তাই-ই হয়েছে। অর্থাৎ র‌্যাব-পুলিশের ক্রসফায়ারে প্রায় সব মৃত্যুর ‘জুডিসিয়াল ইনকোয়ারি’ ও ‘নির্বাহী তদন্ত’ শেষ হয়েছে। বিধি অনুযায়ী দুই ধরনের তদন্তেই গুলি ছোঁড়া বা ক্রসফায়ারে হত্যাকাণ্ড জাস্টিফাইড বা যুক্তিযুক্ত বলে প্রমাণিত হয়েছে। এখন কেউ মামলা করতে চাইলেও ওই মামলা আইনগত বৈধতা পাবে না। এই বিধান স্বয়ং রাষ্ট্রের। এর অন্যতম কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অধিকাংশ পরিবারের সদস্যরা কেউই মামলা করতে যায়নি। তাদের মতামত ছিলো রাষ্ট্র স্বয়ং বাদী হয়ে হত্যাকাণ্ড সংগঠিত করছে। ফলে মামলা করে কোনো ফায়দা হবে না। আর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের বাইরে আমরা তো খালেদা জিয়া এবং আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমেদের বক্তব্য দেখেছি। তারা তো ক্ষমাতাসীন হওয়ার পূর্বেই একটা যুদ্ধ ঘোষণা দিয়ে বা যুদ্ধের অঙ্গিকার নিয়ে ক্ষমতাসীন হয়েছিল। মানবাধিকার রক্ষার তাগিদ বা ঘোষণা তাদের ছিলো না।

এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে তদন্তের অপর অংশ, বিচার ব্যবস্থার মতামত নিয়ে। আমাদের স্মরণ রাখা দরকার বিচার ব্যবস্থার যে অংশটি তদন্তের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলো। ওই অংশটি সরকারের নির্বাহী ক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। আর প্রতিটি সরকার তাদের ইচ্ছামতো ওই অংশকে ব্যবহার করছে। এই দাবিটা শুধু জনগণের নয়, খোদ বিচার বিভগেরও। তা ছাড়া, ’৭১ পরবর্তী বাংলাদেশের জন্মলগ্ন কাল থেকে ক্যাডার প্রশাসনে চাকরির প্রধান অংশটি রাজনৈতিক যোগাযোগের মধ্য দিয়েই ঘটেছে। ’৭৩ সালে জনাব তোফায়েলের ক্যাডার বাহিনী দিয়ে এই প্রশাসনের যাত্রা শুরুর কথা আমরা প্রায় সবাই জানি।

অপরদিকে সরকারের দাবি সংঘটিত ক্রসফায়ার প্রশ্নে অপারেশন ক্লীনহার্টের মতো কোনো দায়মুক্তি অধ্যাদেশের প্রয়োজন নেই। কারণ রাষ্ট্রীয় ভাষায় ঘটনাটি স্বয়ং আইনগত প্রক্রিয়া। তারপরেও ওটার প্রয়োজন পড়ত যদি এক্ষেত্রেও রাষ্ট্রীয় বাহিনী হিসেবে সেনাবাহিনী নামান হত। কেননা আর্মি ‘ল’ এবং পুলিশ ‘ল’-র মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। এই অন্যতম কারণে আর্মড পুলিশ ব্যাটেলিয়ন অর্ডিনান্সের অধীনে র‌্যাব গঠন করা হয়। যাতে হত্যাকাণ্ডগুলো প্রচলিত আইনি কাঠামোর মধ্যেই থাকে। প্রচলিত আইনেই তাকে ন্যায্যতা দেওয়া যায় বলে অনেকে মনে করেন।

একইসঙ্গে জোট সরকার ’৭৪ সালে আওয়ামী শাসনামলের মত আর্মির প্যারালাল বা তার চেয়ে অধিক মানসম্পন্ন রক্ষিবাহিনী সৃষ্টি করে ক্রসফায়ার সংঘটিত করতে যায়নি। কারণ তা করতে গেলে ক্ষমতা কাঠামো টালমাটাল হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো। খোদ আর্মিরই বিগড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো। ফলে পুলিশী মর্যাদার অধীনে অধিক ক্ষমতা এবং বিশেষ সুযোগ,সুবিধা দিয়ে এই এলিট ফোর্স বা র‌্যাব গঠন করা হয়েছে বলে অনেক সমাজ বিশ্লেষক মনে করেন।

আলোচনার এই অধ্যায়ে আরেকটি প্রসঙ্গ উত্থাপন করা জরুরি। বিষয়টি হলো পুলিশ বাহিনী বা পুলিশ অধ্যাদেশ নিয়ে। মূলত আমাদের উপমহাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি ১৮১৩ সালে প্রথম পুলিশবাহিনী গঠন করে। তখন উপমহাদেশ জুড়ে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে কৃষক-জনতার লড়াই চলছিল। ব্রিটিশ সেদিন এই পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলেই মুক্তিকামী জনগণকে প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণের জন্য। পুলিশ প্রশাসন পরিচালনার জন্য যেসব আইন বাংলাদেশেও বিশেষভাবে গণ্য হয়ে আসছে, তার মধ্যে পুলিশ আইন ১৮৬১, ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮, পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল ১৯৪৩ অন্যতম। পরবর্তীতে উল্লিখিত আইনের উপরে ভিত্তি করে মেট্রোপলিটন পুলিশ ‘ল’ ১৯৭৬, ১৯৭৮, ১৯৮৪, ও ১৯৯২ এবং আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অর্ডিনান্স ১৯৭৯ জারি করা হয়েছে। কিন্তু আজো বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১৮৬১, ১৮৯৮ এবং ১৯৪৩ সালের পুলিশ আইনই হলো পুলিশ বিভাগের মূল আইন। আমাদের স্মরণ রাখা জরুরি যে, ১৮৬১ সালের ওই আইন রচনা করা হয়েছিল উপমহাদেশের জনগণ প্রথম উপমহাদেশে জুড়ে যে স্বাধীনতার সংগ্রামের সূচনা করেন, ১৮৫৭ সালে, তাকে হিসাবে রেখে। আর ১৯৪৩ সালে পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গলও জারি করা হয়েছিল ওই বছরে উভয় বাংলায় কৃষকদের শক্তিশালী তেভাগা লড়াইকে প্রতিরোধ করার জন্য। অর্থাৎ তখনকার দিনে শাসক-শোষিতদের মধ্যে সম্পর্ক ছিলো ঔপনিবেশিক শাসক বনাম নিপীড়িত জাতি ও জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক। তার ভিত্তিতেই ওইসব আইন রচনা এবং তার প্রয়োগ চলে সেদিন। ওইসব আইনের আরো লক্ষণীয় দিক ছিলো, বাহিনী হিসেবে পুলিশের যেন কোনো ধরনের ঘোষিত মানবাধিকারের প্রতি আনুগত্য না-থেকে ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি অনুগত থাকে। সরকারও যেন তার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরাসরি ওই সংস্থার তত্ত্বাবধান ও ব্যবহার করতে পারে, সেই ব্যবস্থা করা। সেইভাবে এই সংস্থার কাঠামোগত বিন্যাসও করা হয় এবং সেই ধারা আজো আমাদের দেশে অব্যহত রয়েছে। তাছাড়া ১৮৬১ সালের আইনে পুলিশ যাতে সরাসরি জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সেই ক্ষমতা তাদেরকে দেওয়া হয়েছিল। সেই আইনি ধারাবাহিকতা আজো ধরে রাখা হয়েছে। কিন্তু এখানে মৌলিক বিষয়টি হলো এই, একটি রাষ্ট্র যখন নিজেকে স্বাধীন এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করে ও ঘোষণা দেয়, তখন ওই রাষ্ট্রের পুলিশ জনগণের নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি হিসেবে কোনোভাবেই বিবেচিত হতে পারে না। সংস্থা হিসেবে পুলিশ বাহিনী একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটা ঘটেনি। ফলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, সবার জন্য সমভাবে ন্যায় বিচার পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা, মৌলিক অধিকার হিসেবে মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নে পুলিশের কোনো ধরনের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন নেই। রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের ঘোষিত সংবিধানের কাছেও পুলিশের কোনো ধরনের দায়বদ্ধতা নেই। তার সমস্ত দায়বদ্ধতা ঔপনিবেশিক যুগের মতো হুবহু ক্ষমতাসীন সরকারের স্বরাষ্ট্র বিভাগের কাছে। ঔপনিবেশিক যুগ থেকে একই ধারাবাহিকতা চলে আসছে। ফলে যে সব রাজনৈতিক দল ’৭২ এবং ’৭৫ সালের সংবিধান নিয়ে জনগণকে বিভক্ত করেন এবং কে কতটা গণতান্ত্রিক সেই প্রতিযোগিতায় নামেন। রাজনৈতিক দল হিসেবে তারা কেউই তাদের ঘোষিত সংবিধান ও মানবাধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত করে পুলিশ বাহিনীর কোনো ধরনের কাঠামোগত সংস্কার তো করেইনি, বরং গত ৩৭ বছর ধরে যে লুটেরা শ্রেণী দেশে শাসন করেছে, অবাধে লুঠপাট করেছে, সেই অবৈধ সম্পদ রক্ষা ও বৈধ করার মানসে পুলিশকে তাদের লাঠিয়াল এবং একই সঙ্গে আইনগত মার্ডারার বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলেছে বলে অনেক আইনজ্ঞরা মনে করেন। যার সব থেকে বড় প্রমাণ দেশে চলমান ক্রসফায়ার। আর বিচার বিভাগের নির্বাহী অংশটি গড়া হয়েছে রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডের আইনগত মদতদাতা হিসেবে। এই মতামতটা শুধু দেশের আইনজ্ঞ বা জনগণের নয়। গত ৩০ বছর ধরে আন্তর্জাতিক যে সব সংস্থার সঙ্গে আমাদের সরকারগুলোর দহরম-মহরম, সেইসব সংস্থার রিপোর্টেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সবচেয়ে দূর্নীতিগ্রস্ত খাত হলো পুলিশ ও বিচার বিভাগ।

একই সঙ্গে আমরা এখন এটাও জানি গত ৩৭ বছরের বাংলাদেশে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিমন্ত্রীর নাম বাবর। তার বাড়িতে অবৈধ অস্ত্র পাওয়া গেছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এ-ধরনের ব্যক্তিদের কাছ থেকে ২০ কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণ করে এজাহার থেকে নাম কেটে দিয়েছে। র‌্যাবের গাড়ি কিনতে গিয়ে কয়েক কোটি টাকা লুট করেছে। এবং বর্তমান সরকার তার কাছ থেকেই অবৈধভাবে অর্জিত টাকার সবচেয়ে বেশি আদায় করেছে। দেশের আইন যদি সবার ক্ষেত্রে সমান হয়ে থাকে তাহলে, বাররের অন্তত ১০০ বার ক্রসফায়ার হওয়ার কথা ছিলো, তা কিন্তু হয়নি। র‌্যাবের কর্মকর্তারা কিন্তু এক্ষেত্রে নিশ্চুপ। অর্থাৎ এখন এটা খোলাখুলিভাবে বলা যায় যে, রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে যারা গোটা দেশকে জিম্মি করেছে, রাষ্ট্র ক্ষমতা ব্যবহার করে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করেছে, তারা কেউ ক্রসফায়ারের আওতাভুক্ত নন। এসব রাজনৈতিক লুটেরাদের আইনের কাছে সোপর্দ করা ছাড়া, তাদের কেশাগ্র স্পর্শ করার ক্ষমতাও রাখে না র‌্যাব বাহিনী।

একইভাবে আমরা র‌্যাব-পুলিশের সংবাদ ভাষ্য থেকে কথিত ক্রসফায়ারের ঘটনার পাশাপাশি অস্ত্র উদ্ধারের তথ্য পাচ্ছি। কিন্তু প্রশ্ন অন্যত্র। যেমন অপারেশন ক্লিনহার্ট চলাকালীন সময়ে, সরকারের পক্ষ থেকে দেশের সমস্ত লাইসেন্সকৃত অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এবং দুই দফা তার মেয়াদও বাড়ান হয়। পরবর্তীকালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র থেকে জানান যা, সারা দেশে বৈধ অস্ত্রের সংখ্যা ১লাখ ৮৯ হাজার ১৪২ টি। তার মধ্যে যে অস্ত্র জমা পড়েনি তার সংখ্যা ছিলো ৫০ হাজার। যার লাইসেন্স সরকার বাতিল করেছে। আমাদের প্রশ্ন হলো কাদের হাতে সেসব অস্ত্রের মজুদ রয়েছে? এসব অস্ত্রের লাইসেন্স কারা প্রদান করেছে? এবং র‌্যাব ও পুলিশ বাহিনী এই ৫০ হাজার অস্ত্রের মধ্য থেকে এ যাবৎ কয়টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে? তাদের কয়জনকেই বা ক্রসফায়ার দেওয়া হয়েছে? এসব প্রশ্ন উত্থাপন করার অর্থ এমন নয় যে, দেশে সংঘটিত ক্রসফায়ারকে ন্যায্যতা দিতে গিয়ে তা বলা হচ্ছে। মূলত এসব প্রশ্ন তোলার অন্যতম কারণ হলো, এযাবৎ যারা ক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন ও আছেন তারাই প্রধানভাবে লাইসেন্সকৃত অস্ত্র এবং অবৈধ অস্ত্রের মালিক। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবর তাদের মধ্যে একজন। ক্ষমতায় থাকার সুবাদে তারাই প্রধানভাবে আইনি ও বেআইনি অস্ত্রের মালিক হয়েছেন। অথচ আমরা শ্রেণীগতভাবে তাদের একজনকেও ক্রসফায়ারে যেতে দেখিনি। একই সঙ্গে অপারেশন ক্লিনহার্টের সময় ঘোষিত ৫০ হাজার অবৈধ অস্ত্রের মধ্যে ১টি অস্ত্র উদ্ধারের কাহিনীও শুনিনি। তাহলে কি আমরা ধরে নিতে পারি যে, সকল অবৈধ অস্ত্রবাজ র‌্যাব-পুলিশের টার্গেট নয়। সন্ত্রাস নিমূর্ল ও তাদের লক্ষ্য নয়। বিশেষ বিশেষ সন্ত্রাসী ও অবৈধ অস্ত্রধারীদের প্রতি তাদের পক্ষপাতিত্ব রয়েছে। এবং অপারেশন ক্লিনহার্টের সময় ৫০ হাজার লাইসেন্সকৃত অস্ত্র, অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে- মূলত অবৈধ কর্মকাণ্ড বাড়িয়ে চলার জন্যই? আমার মনে হয় এই গোটা বিষয় আজ পর্যালোচনা হওয়া দরকার।

ক্রসফায়ারে প্রধানভাবে কারা নিহত এবং মিডিয়া নির্মিত সন্ত্রাসী

এ প্রশ্নের জবাব আমাদের সবারই কমবেশি জানা। র‌্যাব-পুলিশের সংবাদ বিবৃতি এবং মিডিয়াকর্মীদের পরিবেশিত সংবাদ থেকেই আমরা তথ্যগুলো জেনেছি। অর্থাৎ নিহতদের প্রধান অংশই একটা বিশেষ ধারার রাজনৈতিক কর্মী, যাদেরকে সংবাদপত্র-র‌্যাব-পুলিশের কর্মকর্তাদের ভাষ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত, বেআইনি, উগ্রপন্থী বা চরমপন্থী দলের সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

Please follow and like us:
error