আমি পারি,আমি করবো (ভিডিও সহ ) !!

0
92

জামাল হোসেন লিটু: শিশুদের গড়ে তোলার দায়িত্বটা যে খুব সহজ, তা কিন্তু নয়! আর এটা কোনও নতুন কথাও নয়! তাই ‘সহজ নয়’জাতীয় কাজগুলোকে সহজ করে নেওয়ার মতো যন্ত্রণা বোধ করি আর নেই। এই যেমন শিশুদের সঠিক সময়ে হিসাব কষে প্রশংসা করতে সত্যি এলেম লাগে। কারণ প্রতিটি কাজের জন্য প্রশংসা হয় না। আবার কাজ হিসেবে প্রশংসার ধরনটাও হতে হয় ভিন্ন। কাজেই কী করলে একটি শিশু ইতিবাচক শক্তি নিয়ে বেড়ে উঠবে, তা রীতিমতো চিন্তা-ভাবনা করার মতো বিষয়।
কেন একটি শিশুর ভেতরের শক্তিকে ইতিবাচকভাবে গড়ে তুলতে হবে? কারণ অভিভাবকের স্নিগ্ধ কথা শিশুদের জন্য একটা শক্তি। এটা শিশুর মধ্যে ‘আমি পারি’এমন মানসিকতার আত্মবিশ্বাসও গড়ে তোলে। শিশুর ব্যক্তিত্বে নিয়ে আসে দারুণ চমক। কোন কাজটি করবো, আর কোনটি নয়, বুঝতে দিতেও সহায়ক। আরও ভালো কিছু করার উৎসাহ দিতে এ এক ইতিবাচক ‘তাগিদ’।
কখন একটা শিশুর ভেতরের শক্তিকে জাগিয়ে তুলবো? যখন একটা শিশু দারুণ কিছু করবে। যখন আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠার চেষ্টা করবে। যখন কোনও কাজ অন্যের সাহায্য ছাড়াই করার চেষ্টা করবে। আসলে একটি শিশুর প্রতিটি চেষ্টাকেই গুরুত্ব দিতে হবে। গুরুত্ব দিতে হবে প্রশংসা বাক্যে, স্নিগ্ধ কথায়, আস্থাপূর্ণ স্পর্শে, দারুণ কিছু উপহারে, মনের কোনও ইচ্ছে পূরণ করে; আরও অনেকভাবেই। আসল বিষয় হলো শিশুকে গুরুত্ব দেওয়া। যথার্থভাবে তা দিতে পারলে একটি শিশুর ভেতরের শক্তি সময়ের সঙ্গেই ইতিবাচকভাবে শাণিত হবে। তবে কখন, কোথায়, কতটুকু দেবো, তা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এই বোঝাটা বাড়বে যদি অভিভাবক হিসেবে যথেষ্ট কোয়ালিটিপূর্ণ সময় কাটানো হয়। তবে নিঃসন্দেহে প্রতিটি বাচ্চাই জন্মগতভাবে নিজস্ব গুণ নিয়ে জন্মায়। এরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের থেকেই ভিন্ন। তবে কিছু সাধারণ ফর্মুলা থাকে, যা অনেকের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা সম্ভব। তবে প্রয়োগের সময় অবশ্যই ভাবতে হবে।

একবার একজন অভিভাবক আমাকে বললেন, ‘দেখুন শিশুদের নিয়ে লেখা আমি নিয়মিত পড়ি কিন্তু আমার বাচ্চার ক্ষেত্রে তো ওগুলো কাজে লাগছে না! আমি বাচ্চাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছি না’। আমি প্রথমেই তাকে বললাম, ‘আপনি তাকে নিয়ন্ত্রণ করার কথা কেন ভাবছেন? ও তো মানুষের বাচ্চা! আপনি তাকে তার মতো করেই বেড়ে উঠতে দিন! কেবল পাশে থেকে তাকে বড় হয়ে উঠতে সাহায্য করুন। আর বই পড়ে বাচ্চা মানুষ করার চিন্তা বাদ দিন। বইয়ের জ্ঞানকে জানার জন্য রাখুন। এর জ্ঞান ব্যবহার করে কী করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তা শিখুন। বই সব সময়ই সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আসল হলেন অভিভাবক, আপনি। সন্তানের সঙ্গে সময় কাটান। তার বিশ্বাস অর্জন করার চেষ্টা করুন। তাকে নিজের চেষ্টায়ই একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করুন। সন্তানকে শেখান, ‘তুমিও পারো’।
কয়েক বছর আগে ভারতীয় চ্যানেলে একটা টিভি সিরিয়াল দেখেছিলাম ‘পারভারিশ’। নাটকের একটা দৃশ্যে স্কুলের একটি অনুষ্ঠানে পারফর্ম করা নিয়ে মেয়েকে উৎসাহ দিচ্ছিলেন মা। মা শেখাচ্ছিলেন, ‘বলো; আমি করতে পারবো, আমি করবো, আমাকে দিয়ে হবে’। কথাটি মনে মনে কয়েকবার বলার পর দেখা গেলো মেয়েটি বেশ সাহসের সাথেই মঞ্চে উঠে গেলো। হ্যাঁ, এটা নাটক ছিল কিন্তু সত্যি বলছি, নিজের প্রতি আস্থা রেখে ‘আমি পারবো’ এ কথাটা বললেই মনের জোর অনেকখানি বেড়ে যায়। এটি একটি শিশুর ভেতরের শক্তিকে ‘রি-ইনফোর্স’ করে ইতিবাচকভাবেই।
তবে মনে রাখতে হবে–শিশুকে ভেতরের উষ্ণতা দেখানো চাই, প্রশংসা বাক্য বলার সময় খুব স্পেসিফিক হলেই ভালো, সময় বুঝে নেতিবাচক শব্দ বা বাক্যগুলো বুঝে-শুনে প্রয়োগ করতে হবে, শিশু কোন কাজটা সঠিকভাবে করেছে, সেটার প্রতিই মনোযোগ দিতে হবে সবচেয়ে বেশি, শিশুকে বুঝতে দিতে হবে, সে আস্তে আস্তে দারুণ একজন মানুষে পরিণত হচ্ছে, শিশুর বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে একটা লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, লক্ষ্যটা এমন হওয়া চাই, যেন শিশু সাধ্যমতো চেষ্টায় আর অভিভাবকের কিছু সাহায্য নিয়ে অর্জন করতে পারে। লক্ষ্য খুব কঠিন বা সহজ হলে শিশু হতাশ হয়ে পড়বে।
তবে কিছু কিছু শব্দ যেমন–আমি কাজ করছি; নিজের কাজ নিজে করো; এ জাতীয় কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। শিশুকে নিয়ে আড়ালে শান্ত বা দুষ্টু এ জাতীয় মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন। কারণ অনেক সময় এরা শুনে ফেলে এবং নেতিবাচক শব্দগুলো ঠিকই বোঝে। শিশুকে ‘কেঁদো না’ কথাটি না বলাই ভালো। আসলে কান্না হলো শিশুর জন্য অনেক ধরনের আবেগ প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। তাকে কাঁদতে মানা না করে বরং বোঝার চেষ্টা করা দরকার যে সে কাঁদছে কেন? ছোট বা বড় ভাই বা বোনের সঙ্গে তুলনা একেবারেই নয়! এতে করে শিশু নিজের মতো করে বেড়ে উঠতে পারে না। আবার ‘এটা তুমি ভালো ভাবেই জানো’এভাবেও বলা ঠিক নয়। কারণ ভুল কি হতে নেই? হতে কি পারে না? থামো, নইলে শাস্তি দেবো বলাটাও অপরাধ। শিশুদের আবার শাস্তি কী? বরং প্রয়োজনে বুঝে শাসন করতে পারেন। কোনও কাজের ক্ষেত্রেই শিশুকে তাড়া দেওয়া ঠিক নয়! এতে বুদ্ধি খাটিয়ে চিন্তার সময় একটা অপ্রয়োজনীয় বাধা পড়ে। আর ‘খুব ভালো, দারুণ’; একটু বুঝেশুনেই বলা চাই। কারণ আবেগ নিয়ন্ত্রণ করাটাও তো শিখতে হবে!
অভিভাবক হয়ে ওঠা দারুণ কঠিন একটা কাজ। তবু চেষ্টা চালিয়ে যেতেই হয়। এ চেষ্টায় কোনও ফর্মূলা নেই বরং নিজের জ্ঞান, বুদ্ধি, মেধা, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, ধৈর্য দিয়ে শিশুকে বুঝতে হবে। ‘সকল শিশু’ নয় বরং বলা হোক ‘প্রতিটি শিশু’। প্রত্যেকেই নিজ নিজ ব্যক্তিত্বে অনন্য। অভিভাবক হিসেবে সেটা বুঝতে চেষ্টা করুন। শিশুকে মনে মনে বলতে শেখান, ‘আমি পারি, আমি পারি, আমি পারি’।

Please follow and like us: