শিবপুরে ইউএনওর হস্তক্ষেপে বাল্যবিবাহ বন্ধ করেছে মুক্ত খবর পরিবার।

0
315
প্রতিকি ফটো।

হাসিবা আক্তার:
বাল্যবিবাহ রোধে বাংলাদেশের বর্তমান ভূমিকা প্রশংসিত হচ্ছে। এ বছর প্রকাশিত ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে বাল্যবিবাহের হার কমেছে। তবে নিরাপদ নয়। এখনও বিশ্বের প্রতি পাঁচজন কিশোরীর মধ্যে একজনের বিয়ে হয় ১৮ বছরের কম বয়সে। ইউনিসেফ আশা করে ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার শূন্যের কোঠায় নেয়া সম্ভব হবে। বাল্যবিবাহ রোধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে। যেখানে বাল্যবিবাহের হার ১০ শতাংশ কমেছে। যদিও বাল্যবিবাহ রোধে বাংলাদেশের অগ্রগতি সামান্য তবে স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর অবস্থান এবং সাধারণের মধ্যে সচেতনতা বেড়ে যাওয়ায় নিত্যদিনই মাঠ পর্যায়ে বাল্যবিবাহ ঠেকিয়ে দেয়া হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলে দেয় : বর্তমানে স্কুল শিক্ষার্থীরাই সহপাঠীদের বিয়ে বন্ধে প্রশাসনকে সহায়তা করছে।

ফাইল ফটো।

অজপাড়াগাঁয়ের এক কিশোরী সানি আক্তার। শিবপুর উপজেলার দুলালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী। বাবা দরিদ্র ঠিকাদারি কাজ করেন, মা গৃহিণী। দুই ভাই-বোনের মধ্যে বড় সানি আক্তার। লোখাপড়া করে নিজের পায়ে দাঁড়াবে, অসহায় মানুষের কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেবে- এমন ব্রত নিয়ে সে এগিয়ে যাচ্ছিল।
কিন্তু দরিদ্র ঘরে জন্ম নেয়ায় কাল হয়ে দাঁড়ায়। তার লোখাপড়ায় ব্যয় করাতে পারছিল না দরিদ্র পিতা। জেএস সি পরীক্ষার দু’মাস আগে বাবা-মা সানির বিয়ে পাকা করে। নিজের বিয়ের কথা শুনে মুষড়ে পড়ে সানি। সোনালি শৈশবে তার স্বপ্ন ভেঙে যাওয়া পথে। বাবা-মায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে সানি। নিজের রক্ত বিক্রি করে লেখাপড়ার খরচ চালাবে অভিভাবকে জানালেও তা মানতে নারাজ। সানি তার নিজের বিদ্যালয়ে বছর খানেক আগে জীবনদক্ষতার ওপর প্রশিক্ষণ পেয়ে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতন।

বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে অবগত সে। তাই নিজের বিয়ে ঠেকাতে সে আশ্রয় নেয় মুক্ত খবরের শিবপুর উপজেলা প্রতিনিধি আশরাফের। সানির কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিলু রায় এবং দুলালপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যন সফিক কে বিষয়টি অবগত করেন আশরাফ।ইউএনও আসতে পারেননি ঠিকই,কিন্তু এই বাল্য বিবাহ ঠেকাতে সব রকমের সহযোগিতা করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন শিলু রায়।
আশরাফ নিজেই লোকজন নিয়ে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আকস্মিকভাবে মেয়েটির বাড়িতে হাজির হন। প্রশাসনের উপস্থিতিতে পরিবারের লোকজন সটকে পড়ার চেষ্টা করেন। পরে স্থানিয়রা দুই পরিবারকে ডেকে অল্প বয়সে মেয়ে বিয়ে অতঃপর শারীরিক ও মানসিক পরিণতি কি হয় সে সম্পর্কে বাল্যবিবাহের কুফল বিষয়ে বোঝান। প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত মেয়েকে বিয়ে দেওয়া যাবে না—এমন শর্তে মুচলেকা আদায় করেন।
বোঝাতে সক্ষম হলে বাল্যবিবাহের হাত থেকে রক্ষা পায় সানি। সানি রক্ষা পেলেও তার মতো জেএসসি পরীক্ষার আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছে অনেক কে।।

সানির মতো প্রতিবাদী না হওয়ায় তাকে অল্প বয়সেই লেখাপড়া ছেড়ে সংসার কাঁধে নিতে সুমি কে। বালিয়াডাঙ্গী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী হাবিবা আক্তার সুমি। তার পিতা ফুলতলা গ্রামের আবদুল হালিম একজন কুলি সর্দার। ইচ্ছে আছে লেখাপড়া করে সে গ্রামের অবহেলিত মানুষের চিকিৎসা দেবে। কিন্তু অভাবি ঘরে জন্ম নেয়া হাবিবাকে না জানিয়ে ৪ মাস আগে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে অভিভাবক। সেখানে ছেলে পক্ষ হাবিবাকে দেখে পছন্দ করে মোটা অঙ্কের যৌতুকের বিয়ে ঠিক হয়।

কিন্তু আত্মপ্রত্যয়ী হাবিবা নিজের বিয়ের কথা জানতে পেরে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ড. টিএম মাহবুবর রহমানের শরণাপন্ন হয়। এর পর ওই শিক্ষকের সহযোগিতায় হাবিবা বাল্যবিবাহের অভিশাপ থেকে রক্ষা পায়। শুধু এই দু’জনই নয়, তাদের মতো শাহনাজ, আশামনি, কারজিনা আক্তার কেয়াসহ ৫০ জন কিশোরী নিজের বিয়ে ঠেকিয়েছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিলু রায় বলেন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে এলাকায় এখন সামাজিক বিপ্লব শুরু হয়েছে। এর ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি বেড়েছে। এ উপজেলায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে স্টুডেন্টস ডাটাবেজ কর্মসূচি চালু হওয়ায় গ্রামে ও স্কুলে গড়ে উঠেছে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ মঞ্চ।

ফাইল ফটো।

ইউএনও অফিসের তথ্য মতে ২০০৯, ২০১০ ও ২০১১ সালে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া ৫৫ ভাগ ছাত্রীই এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার আগেই শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়তো। আর বাল্যবিবাহের শিকার হতো এসব কিশোরী। বড় হওয়ার স্বপ্নের জাল বুনতে পারত না তারা। অজ্ঞতা, দরিদ্রতা ও যৌতুক এবং সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে কিশোর কন্যাদের বিয়ে দিতো অভিভাবকরা।অকাল মৃত্যু, বিবাহ বিচ্ছেদও হতো অহরহ। লেগেই থাকে পারিবারিক অশান্তি।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ও স্কুলে ঝরে পড়া রোধকল্পে ২০১৫ সালে একটি উদ্ভাবনী ধারণা পাঠানো হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। সে ধারণা গ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রী দপ্তরের এটুআই প্রকল্প পরিচালক। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ প্রস্তাব অনুমোদন হলে ২০১৬ সালে সেপ্টেম্বরে এই উপজেলায় শুরু হয় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কর্মসূচি। শুরু হয় বাল্যবিবাহ, ইভটিজিং, যৌতুক, নারী নির্যাতন ও মাদক প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ আর স্কুলে স্কুলে সভা-সেমিনার। পাড়া-মহল্লায় জারি গানসহ ব্যাপক প্রচারণা। এর ফলে সচেতন হয়ে উঠছে এই উপজেলার গ্রামাঞ্চলের অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এগিয়ে এসেছে জনপ্রতিনিধি, মসজিদের ইমাম, পুরোহিত ও সমাজকর্মীরা। আর অল্প বয়সে বিয়েতে মতো দিচ্ছে না মেয়েরা। নিজের বিয়ে ঠেকাতে স্কুলপড়ুয়া ছাত্রীরা দ্বারস্থ হচ্ছে প্রশাসনের।

শিক্ষার্থীরা বলছে, মেয়েদের উচ্চ শিক্ষার প্রধান বাধা যৌতুক ও বাল্যবিবাহ। এর হাত থেকে রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে সকলকে। আর অভিভাবকরা বলছেন, দরিদ্রতা, যৌতুক ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাবেই বাধ্য হচ্ছেন অপরিণত বয়সে কন্যাসন্তানদের বিয়ে দিতে হয়।

এই উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যন সফিক বলেন, দশম শ্রেণিতে উঠার আগে ৫৫ ভাগ ছাত্রী ঝরে পড়ত। এর প্রধান কারণ ছিল বাল্যবিবাহ ও দরিদ্রতা। তিনি আরো বলেন, বাল্যবিবাহ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ড্রপআউট প্রতিরোধে ৬২টি স্কুল-মাদরাসার ১৭ হাজার শিক্ষার্থীকে স্টুডেন্ট ডেটাবেজের আওতায় আনা হয়েছে। এ ডেটাবেজে বাদ পড়েনি শিক্ষক, কাজী ও নিকাহ রেজিস্ট্রার, ইমাম, পুরোহিতরাও জানান এই কর্মকর্তা

শিবপুর উপজেলা প্রতিনিধি মো. আবদুল আশরাফ বলেন, গতকাল তার এক বান্ধবির মাধ্যমে আমি বিষয়টি জানতে পারি ।আজ শুক্রবার সকাল থেকে চলছিল বিয়ের আয়োজন। বিয়ের পাত্রী দুলালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেনীর ছাত্রি সানি আক্তার।সকাল থেকে চলছিল রান্নার কাজ। বিয়ের গেট-প্যান্ডেলও করা হয়েছে। শুধু বর আসার অপেক্ষা। কিন্তু বর আসার আগেই এই বাড়িতে হাজির হই আমি দুলালপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যন সফিক সাহেব এবং স্থানীয় কয়েকজন।দু-পরিবাকে বোঝাতে সক্ষম হলে,সানি এই বাল্যবিবাহের অভিশাপ থেকে রক্ষা পায়।

Please follow and like us: