গুতেরেসের ফোন এবং প্রধানমন্ত্রীর পর্যবেক্ষণ !

0
58

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

আবারো রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের পদক্ষেপের প্রশংসা করলেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। গত শুক্রবার রাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে টেলিফোন করেন গুতেরেস। রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দান নিয়ে শুধু জাতিসংঘের মহাসচিবই নন, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করেছেন। কেউ যখন কোনো প্রশংসনীয় কাজ করেন তখন তার প্রশংসা হতেই পারে। তবে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানকে কেন্দ্র করে যখন জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশগুলো প্রশংসা করছে তখন স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মনে এই প্রশ্ন জাগতে পারে যে, যে মিয়ানমারের জন্য এই লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসল সেই মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিসংঘসহ এসব রাষ্ট্র ও সংস্থাগুলো কী বাস্তব পদক্ষেপ নিতে পারল।

এরই মধ্যে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব সলিল শেঠির কাছে এই প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বীকার করলেন, ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাস্তব কোনো অগ্রগতি নেই।’ রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর এবং দু’দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের সফরের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছি কিন্তু, বাস্তবে কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না।’ অর্থাৎ যতোই দূতিয়ালি করা হোক, এক্ষেত্রে মিয়ানমার নানা বাহানায় শুধুই সময় ক্ষেপন করছে এই আশায় যে, কবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ নিয়ে হাল ছেড়ে দেয়। প্রধানমন্ত্রী যে ‘অগ্রগতি’ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করলেন তা শুধু মিয়ানমারের তরফ থেকেই নয়, আন্তর্জাতিক তরফ থেকেও। গুতেরেস এর ফোন করার সময় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পাদিত চুক্তি বাস্তবায়নে জাতিসংঘের সহযোগিতা চেয়েছেন শেখ হাসিনা। কিন্তু এখানে কথা হচ্ছে, জাতিসংঘ কি বাংলাদেশকে অসহযোগিতা করছে যে, প্রধানমন্ত্রী গুতেরেস এর কাছে জাতিসংঘের সহযোগিতা চাইলেন? ইতোমধ্যে জাতিসংঘ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কয়েকটি প্রস্তাবও এনেছে বাংলাদেশের পক্ষ নিতে গিয়ে।

কিন্তু তাতে কতটুকু কাজের কাজ হলো? যদি তা না-ই হয়, তাহলে বুঝতে হবে এক্ষেত্রে জাতিসংঘেরও যথেষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যে সীমাবদ্ধতার কারণেই মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এবং বাংলাদেশের পক্ষে জাতিসংঘ প্রয়োজনীয় ‘সহযোগিতা’ দিতে পারছে না। তারপরও জাতিসংঘ যথেষ্ট চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গা সংকট শুরুর পর গুতেরেস নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপ চেয়ে এক নজিরবিহীন চিঠি দেন। এরপর নিরাপত্তা পরিষদে এ নিয়ে কয়েক দফা আলোচনা হয়। চীন ও রাশিয়ার বিরোধিতার কারণে নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো প্রস্তাব পাস হয়নি, তবে নেপিদো যে এরপর থেকেই প্রচ- কূটনৈতিক চাপে পড়েছে এতেও কোনো সন্দেহ নেই। গুতেরেসও বহুবার রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে সরব হয়েছেন। মিয়ানমারের সমালোচনাও করেছেন তিনি। আর এ কারণেই অবশেষে জাতিসংঘ প্রতিনিধিদলকে রোহিঙ্গা বিষয়ে পর্যবেক্ষণে মিয়ানমারে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে। তবে এই প্রবেশানুমতি কতটুকু, রাখাইনে যেখানে রোহিঙ্গাদের পোড়োজমি পড়ে আছে সেখানে সেই প্রবেশানুমতি থাকবে কিনা, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের পরিণতি কি হবে এ নিয়ে এখনো একটা অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। আর এই অনিশ্চয়তাকে সামনে রেখেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর মহাসচি সলিল শেঠিকে বলেছেন, ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাস্তব কোনো অগ্রগতি নেই।’ আর প্রধানমন্ত্রীর এই হতাশার একদিন পরই জাতিসংঘের মহাসচিব গুতেরেস প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করলেন। আর এখানেই এই ফোন করার তাৎপর্যটি নিহিত। মনে হয়, গুতেরেস তার প্রশংসার অপর পিঠে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধৈর্য ধরারই ইঙ্গিত করেছেন। যে এই অন্ধকার কেটে যাবে।

শিগ্গিরই দেখা দেবে বাংলাদেশের দক্ষিণের আকাশে আলোর দিগন্ত। রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক প্রত্যাবাসন হবেই হবে। মিয়ানমারকে বাধ্য হতেই হবে। এই তো কিছুদিন আগে আসিয়ানভুক্ত যে ফিলিপাইন জাতিসংঘের আনীত প্রস্তাবে মিয়ানমারের পক্ষ নিয়েছিল সেই ফিলিপাইনই আজ রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সরব। দেশটির প্রেসিডেন্ট দুতার্তে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন মিয়ানমার এক্ষেত্রে যা করেছে তা পরিষ্কার গণহত্যা। এটা আমাদের সরকার প্রধানও আজ পর্যন্ত পরিষ্কার করে বলতে পারেনি। যা দুতার্তে বলতে পারলো। পাশাপাশি তিনি জানিয়ে দিয়েছেন রোহিঙ্গাদের তারা আশ্রয় দিবেন। এক্ষেত্রে তিনি বিশ্বের আরো অন্যান্য দেশকেও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে বলেছেন। রোহিঙ্গা প্রশ্নে ফিলিপাইনের এই পরিবর্তন তো অগ্রগতিই। এখন চীন, রাশিয়া, ভারত দুতার্তের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলালেই সে অগ্রগতির ষোলকলা পূর্ণ হয়। এ জন্য ‘মাথা ব্যথা’ যার সেই আমাদের সরকারকেই সবচেয়ে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে।

Please follow and like us: