কাজী ওয়াশিমুল হক:(আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট)

১) যেকোন অপরাধের সাধারনতঃ দুইটি অংশ থাকে, অপরাধ এবং অপরাধ করার ইচ্ছা। জেনে রাখা ভাল অপরাধ করার ইচ্ছা না থাকলেও আপনার কোন কাজের কারনে অপরাধ হতে পারে। কিন্তু আপনার মনের মধ্যে অপরাধ করার যত কুবুদ্ধিই থাকুক না কেন, যে পর্যন্ত তা আপনি বাস্তবে পরিনত করার উদ্যোগ না নিবেন সে পর্যন্ত আইন আপনাকে শাস্তি দিতে পারবে না।
২) কারো বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ ওঠা মানেই সেই অভিযোগ প্রমান হয়ে যাওয়া নয়। অভিযোগ সন্দেহাতীত ভাবে প্রমানের আগ পর্যন্ত কোর্ট ধরে নেবে অভিযুক্ত নির্দোষ। আপনি যদি অভিযোগ করেন যে দবির আপনার টাকা মেরে দিয়েছে, সেটা প্রমান করার দায়িত্ব আইনগতভাবে আপনার, দবিরের না। আপনি যখন অভিযোগ প্রমানের জন্য কোর্টে আইনী ধস্তাধস্তি করবেন তখন দবির যদি কাঠগরায় দাঁড়িয়ে চিনাবাদাম চিবোয় বা আপনার দিকে কৃপাদৃষ্টিতে তাকায়, তাহলে আপনি তখন আইনগত ভাবে, ওয়েল, কিছুই করতে পারবেন না। তবে হ্যা, আপনি যদি আপনার অভিযোগ আইনগতভাবে প্রমান করে ফেলতে পারেন, তখন আপনার চীনাবাদাম চিবোনর পালা।
৩) আইন সবার জন্য সমান এটা যেমন সত্য আবার তেমনি আইনে ‘All are equal but some are more equal than the others’ এটাও সত্য। বুঝিয়ে বলি, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগকারীর সামাজিক এবং শিক্ষাগত অবস্থান যদি অনেক উচু হয় তাহলে কোর্ট সাক্ষ্যপ্রমান নিয়ে তত কড়াকড়ি নাও করতে পারে। উদাহরন দেই, মনে করুন একজন সম্ভ্রান্ত বংশীয় (বাংলা বইয়ের লেখক টাইপ সম্ভ্রান্ত বংশীয় না, আসল ক্যাটেগরী) উচ্চ শিক্ষিতা মহিলা কারো বিরুদ্ধে ধর্ষন কেস করলেন। একজন পতিতা যদি এই কেস করতো (জী, আইনগত ভাবে তাদেরও অধিকার আছে ধর্ষিতা না হবার), কোর্ট যে পরিমান প্রমান চাইতো বা অভিযোগটা যতখানি অবিশ্বাসের নজরে দেখতো, এই ক্ষেত্রে সেটা করবে না। কোর্ট ধরে নেবে আসলেই এমন কোন ঘটনা না ঘটলে এই শ্রেনীর একজন মহিলা এমন একটা অভিযোগ তুলতেন না।
৪) আইনে স্নেহ, মায়া, মমতা, আদর, এইসব জিনিসের কোন পজিটিভ ভ্যালু নেই, অর্থাৎ, এগুলি দেখিয়ে আপনি আইনগতভাবে বাড়তি কোন কিছু চাইতে পারেন না। আপনি পিতামাতাকে আজীবন সেবা করেছেন বা আপনি ছোট ছেলে, আপনার বাবা মা আপনাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন, তার মানে এই না যে এই সব কারন দেখিয়ে আপনি তাদের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে বেশী অংশ দাবী করতে পারবেন। অপরদিকে তালাকের পর আপনি যদি দেখাতে পারেন যে আপনার এক্স পার্টনার (কোর্ট যার কাছে আইনগত ভাবে বাচ্চাদের দেবে) আপনার বাচ্চাদের আদর করে না, অকারনে মারধোর আর নিষ্ঠুর আচরন করে (নেগেটিভ ভ্যালু!) তাহলে বরং তার বদলে আপনি বাচ্চাদের পেতে পারেন।
৫) আপনার আইনগত অধিকার সম্পর্কে পরিস্কার ধারনা রাখুন। সবার কাছ থেকে শুনে আপনি যেটাকে আইন বলে জানেন (যেমন মায়ের সম্পত্তি মেয়েরা বেশী পায় বা মেয়েরা নিজেরা তালাক দিলে দেনমোহরের টাকা পায়না, এই ধরনের আজগুবী ব্যাপার) সেটা আসলে আইন নাও হতে পারে। ভাল কোন উকিলের কাছ থেকে পরামর্শ নিন বা আইনের বইপত্র ঘাটুন।
৬) ধর্মীয় আইন বা সামাজিক মূল্যবোধ সব সময় আইন দ্বারা সমর্থিত হয়না, এ ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। আপনি সারাজীবন বাবা-মার সেবা করেছেন, এমনকি বাবা-মাকে সেবা করতে যেয়ে নিজের ছেলে মেয়েকে অবহেলা করেছেন, সেই বাবা-মাই যদি আপনাকে বাদ দিয়ে তাদের সব সম্পত্তি আপনার অন্য ভাই বোনদের হেবা করে দেয়, তখন আপনি সামাজিক ভাবে কি করতে পারবেন জানিনা তবে আইনগত ভাবে যে আঙ্গুল চোষা ছাড়া আর কিছু করতে পারবেন না, সেটা এখনই বলে দিতে পারি।
৭) যেসব ব্যাপারে সাধারনতঃ কাগজপত্র জড়িত থাকে (যেমন ধরুন আর্থিক লেনদেন), সে সব ব্যাপারে কোর্টের দ্বারস্থ হলে কোর্ট সবার আগে সম্পর্কিত কাগজগুলি চাইবেন। যদি সেগুলি দেখাতে না পারেন তাহলে আইনগত কোন সমাধান পাবার আশে ক্ষীন বলেই ধরে নিতে পারেন। আপনি কত ‘অসহায়’, ‘সম্বলহীন’, ‘নির্যাতিত’, ‘নিঃশেষিত’, ‘নির্বাপিত’…ইত্যাদি ইত্যাদি (হানিফ সংকেত) এসব দেখার দায়িত্ব কোর্টের না। কোর্ট দেখবেন আপনার বক্তব্য প্রমান করার মত কিছু আপনার হাতে আছে কিনা।
৮) কারো বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ প্রমানের জন্য সেটা আইনের সামনে সন্দেহাতীত ভাবে প্রমান করতে হয়। সবাই জানে, সবাই শুনেছে, সবাই এটা বলছে, এ ধরনের কোন বক্তব্য আইনের কাছে গ্রহনযোগ্য নয়।
৯) সামাজিক এবং ধর্মীয় যুক্তি প্রচলিত আইনের কাছে গ্রহনযোগ্য নাও হতে পারে, কথাটা মনে রাখলে ভাল করবেন। মোটা দাগে উদাহরন দেই, কোন মুসলিম স্বামী যদি তার স্ত্রীকে কোনরূপ কারন দর্শানো ব্যাতীত তালাক দিতে চায় (সেটা সামাজিক বা ধর্মীয় ভাবে যতই নিন্দার্হ হোক না কেন) সে তা দিতে পারে আইনে তাতে কোন বাধা নেই।
১০) আইন না জানা কোন দেশেই শাস্তি এড়ানোর গ্রহনযোগ্য পন্থা না।
১১) লাস্ট বাট নট দি লীস্ট, জেনে রাখা ভাল, দাম্পত্য জীবনে মানসিক নির্যাতন বা অপমান বাংলাদেশের কোন আইনেই পরেনা।

 

Please follow and like us:
error