বাংলাদেশে তরুণ সমাজে ইয়াবার আসক্তি ক্রমেই ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। শহর ছাড়িয়ে গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে এই মারাত্মক নেশা। স্কুল-কলেজের কিশোর, এমনকি কিশোরীরাও ক্রমে এই নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। হু হু করে বাড়ছে আসক্ত কিশোর ও তরুণের সংখ্যা। চোখের সামনেই দেখতে হচ্ছে মাদকাশক্তদের নানান অপকর্ম।  এর প্রধান কারণ ইয়াবার সহজলভ্যতা। গত রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের টেলিভিশন চ্যানেল সিএনএনের অনলাইন ভার্সনে বাংলাদেশে ইয়াবার বিস্তার নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তাতে দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশে কত দ্রুত ইয়াবা ছড়িয়ে পড়ছে। জানা যায়, ২০১৬ সালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দুই কোটি ৯০ লাখ ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করেছে। ২০১০ সালের তুলনায় এ সংখ্যা ৩৫ গুণ বেশি। ইয়াবা ব্যবহারকারী ৮৮ শতাংশের বয়স ৪০ বছরের নিচে। সিলেট নগরীতে চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৫ শতাংশ মাদকসেবীর বয়স ২২ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে।

ইয়াবা অর্থ পাগলের ওষুধ। এটি মূলত মেথামফিটামিন, সঙ্গে ক্যাফেইনও ব্যবহৃত হয়। এটি অত্যন্ত সক্রিয় একটি মাদক এবং এর নেশা থেকে বেরিয়ে আসা খুব কঠিন। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ইয়াবা তৈরি হয় মিয়ানমারে। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি মিয়ানমারে ৩৭টি কারখানায় ইয়াবা তৈরি হয়, যেগুলোর প্রধান লক্ষ্য বাংলাদেশ। দীর্ঘমেয়াদে ইয়াবা ব্যবহারের প্রতিক্রিয়া হিসেবে হাইপোথার্মিয়া, অনিদ্রা, অমনোযোগিতা, কাঁপুনি, খিঁচুনি, দুশ্চিন্তা, আগ্রাসী মনোভাবসহ নানা উপসর্গ দেখা দিতে পারে। লিভার, কিডনিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একপর্যায়ে এরা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারে। তখন নিজের মা-বাবাকে হত্যাসহ এমন কোনো অপরাধ নেই যা তারা করতে পারে না। যতদূর জানা যায়, কারখানা পর্যায়ে একেকটি ট্যাবলেটের দাম পড়ে ১৩ টাকা, টেকনাফ পর্যন্ত আসতে দাম হয়ে যায় ৫০ টাকা এবং ঢাকায় বিক্রি হয় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায়। সাধারণত উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরাই এমন ব্যয়বহুল মাদকের ব্যবহারকারী। আবার ছাত্র-যুব রাজনীতির সঙ্গে জড়িত অনেক অবৈধ উপার্জনকারীও ইয়াবায় আসক্ত। শীর্ষস্থানীয় অনেক রাজনীতিবিদ এদের ব্যবহার করে এবং অবৈধ উপার্জনের পথ করে দেয়। অনেক মাদকসেবী অর্থ জোগাড়ের জন্য চুরি-ডাকাতিতেও জড়িয়ে পড়ে। তখন ইয়াবার সঙ্গে অস্ত্রেরও একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠে। জানা যায়, জঙ্গিরাও অর্থ সংগ্রহের জন্য ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে যায়। তাই ইয়াবার ক্ষতিকারকতা বহুমুখী।

ইয়াবা আমাদের দেশের তরুণ যুবসমাজকে গ্রাস করেছে। প্রতিদিন যেমন ইয়াবা ধরা হচ্ছে তেমনি প্রতিদিন হাজার হাজার পিস ইয়াবা তরুণরা গ্রহণ করছে।

তথ্যমতে, ঢাকা শহরে মাদকাসক্ত শিশুর প্রায় ৩০ শতাংশ ছেলে এবং ১৭ শতাংশ মেয়ে। ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ছেলে ও মেয়ে শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন জানায়, মাদকাসক্ত ৮০ শতাংশ পথশিশু মাত্র ৭ বছরের মধ্যে অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি জরিপের হিসাব অনুযায়ী, মাদকাসক্ত শিশুদের ড্রাগ গ্রহণ ও বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত ৪৪ শতাংশ পথশিশু, পিকেটিংয়ে জড়িত ৩৫ শতাংশ, ছিনতাইয়ে ১২ শতাংশ, মানবপাচার সহায়তা কাজে ১১ শতাংশ, দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের সহায়তাকারী হিসেবে ৫ শতাংশ ও অন্যান্য ভ্রাম্যমাণ অপরাধে জড়িত ২১ শতাংশ। এ ছাড়া বোমাবাজিসহ অন্যান্য সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত ১৬ শতাংশ পথশিশু।

আরো বেশ কয়েকটি সংস্থার তথ্যানুযায়ী, অবৈধ মাদকদ্রব্য আমদানির জন্য প্রতি বছর ১০ হাজার কোটিরও বেশি টাকার মুদ্রা বিদেশে পাচার হচ্ছে। একটি পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে যে, মাদকসেবীরা গড়ে প্রতিদিন অন্তত ২০ কোটি টাকার মাদক সেবন করে থাকে। হিসাব অনুযায়ী মাসে ৬০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে সারা দেশে প্রায় ৩০ লাখ মাদক ব্যবসায়ী প্রতিদিন কমপক্ষে প্রায় ২০০ কোটি টাকার মাদক কেনাবেচা করে।

বাংলাদেশের শহর জনপদের ধনী পরিবারের সন্তানদের মধ্যে সম্প্রতি ইয়াবা আসক্তির যে প্রবণতা দেখা দিয়েছে তা সমগ্র জাতির জন্য এক ভয়াবহ পরিণতির ইঙ্গিতবাহী। ইয়াবা কেবল আমাদের তরুণ প্রজন্মের প্রাণশক্তি ও মেধাকে ধ্বংস করছে না, ইয়াবার কারণে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অপসংস্কৃতি ও অপরাধের বিস্তার ঘটছে। সাম্প্রতিককালে কয়েকটি লোমহর্ষক কাহিনী আমাদের সবার বিবেককে নাড়া দিয়ে গেছে। কোনো কোনো পত্রিকার শিরোনাম ছিল- ‘নেশাগ্রস্ত যুবকের গুলিতে জোড়া খুন’ অন্যটি ছিল ‘মাদকাসক্ত মেয়ে নিজ হাতে বাবা-মাকে খুন করলো’ আরো অন্যান্য খবর ছিল- ‘ইয়াবা সেবনে বাধা দেয়ায় খুন হলেন মা-বাবা’। এই ধরনের ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়

ইয়াবার এই বিস্তার নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় চলে যাওয়ার আগেই সর্বাত্মকভাবে তা প্রতিরোধের উদ্যোগ নিতে হবে।প্রয়োজনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সমন্বয়ে দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করবে।বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্ট গার্ডকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখতে হবে। সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর সহযোগিতাও নেওয়া যেতে পারে।

ইয়াবার পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি আসক্তরা এর উপর শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। একবার ইয়াবা নেয়ার কয়েক ঘণ্টা বা নির্দিষ্ট সময় পর আবার না নিলে শরীরে ও মনে নানা উপসর্গ দেখা দেয়, ফলে বাধ্য হয়ে আসক্তরা আবার ফিরে যায় নেশার জগতে।

তবে হ্যাঁ, যারা আবার ফিরে পেতে চায় স্বাভাবিক সুস্থ জীবন তাদের নিরাশ হওয়ার কিছু নেই। এমন নয় যে, আসক্তরা আর কখনোই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবে না। তবে এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শে বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি আসক্তদের আশার আলো দেখাচ্ছে; তারা ফিরে যেতে পারছে মাদকমুক্ত জীবনধারায়। ওষুধ, সাইকোথেরাপী ও অন্যান্য উপায়ে মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবনযাপন পদ্ধতিতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়, পরিবর্তন করার চেষ্টা করা হয় তার আগের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, যা তাকে মাদকাসক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। এতে মানসিক রোগ চিকিৎসক ও সাইকোলজিস্টের যেমন ভূমিকা রয়েছে, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে পরিবার, স্বজন আর প্রকৃত ভাল বন্ধুরও। একজন নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি সবার সম্মিলিত সহযোগিতাতেই আবার ফিরে পেতে পারে মাদকমুক্ত সুস্থ জীবন।

পরিবারের করণীয়

পারিবারিক পরিবেশ হতে হবে ধূমপানমুক্ত। সন্তানদের কার্যকলাপ এবং সঙ্গীদের ব্যাপারে খবর রাখতে হবে। সন্তানরা যেসব জায়গায় সবসময় যাওয়া-আসা করে সে জায়গাগুলো সম্পর্কে জানতে হবে। সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, যাতে করে তারাই নিজে থেকে তাদের বন্ধু-বান্ধব ও কার্যাবলী সম্পর্কে আলোচনা করে। পরিবারের সব সদস্যই ড্রাগের ক্ষতিকারক বিষয়গুলো সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করবেন। ধৈর্য ধরে সন্তানদের সব কথা শোনার জন্য অভিভাবকরা নিজেদের প্রস্তুত করবেন। সন্তানদের মঙ্গলের জন্য পরিবারের সদস্যরা যথেষ্ট সময় দেবেন। সন্তানদের সামাজিক, মানসিক, লেখাপড়া সংক্রান্ত অর্থনৈতিক চাহিদাগুলো যথাসম্ভব মেটাতে হবে, তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত দিয়ে তাদের প্রত্যাশা বাড়তে দেয়া যাবে না। পরিবারের সদস্যরা পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন, প্রায়ই তারা সবাই মিলে আনন্দদায়ক কিছু কার্যকলাপের পরিকল্পনা করবেন এবং পরিবারের সবাই মিলে সুন্দর সময় কাটাবেন। ‘গুড প্যারেন্টিং’ বিষয়ে জ্ঞান নিতে হবে বাবা-মাকে।

সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ভূমিকা

জনমত সৃষ্টির মাধ্যমে এই ভয়াবহ সমস্যাটি মোকাবিলা করতে হবে। প্রশাসনকে মাদকের উত্পাদন এবং এর অবৈধ ব্যবসা নির্মূল করতে হবে। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে আসক্তির ক্ষতিকারক দিকগুলো সম্পর্কে আলোচনা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মাদকবিরোধী প্রচারণার মাধ্যমে সবাইকে এর কুফল সম্পর্কে জানাতে হবে। মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে সাংগঠনিক দক্ষতা, ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি ও কর্মসূচির ধারাবাহিকতার নিশ্চয়তা থাকতে হবে। মাদকাসক্তির নির্বিষকরণ প্রক্রিয়ায় শরীরের সঙ্গে মাদকের জৈব-রাসায়নিক নির্ভরশীলতা দূর হয়ে শরীর তার নিজস্ব গতি-প্রকৃতিতে ফিরে এলেও মাদক গ্রহণের মূল প্রভাবক (ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব, চরিত্র, মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা, আবেগ, অনুভূতি, চিন্তাধারা ইত্যাদি ক্ষেত্রে অসঙ্গতি) দূর করার জন্য নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি চিকিত্সা, কাউন্সেলিং ও থেরাপি প্রয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে।

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মুনতাসীর মারুফ, বলেন-ইয়াবার আগ্রাসন থেকে দেশের যুব সমাজকে রক্ষা করতে প্রয়োজন সামগ্রিক প্রতিরোধ। পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে যেসব পথে দেশে ইয়াবা ঢুকছে, সেসব জায়গায় আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে। দেশের ভেতর ইয়াবার উৎপাদন ও সরবরাহ বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। মাদক ব্যবসায়ী ধরা পড়লে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। ইয়াবার কুফল সম্পর্কে সকলকে বিশেষত উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীদের সচেতন করতে হবে।

 

Please follow and like us:
error