ইউসুফ সোহেল:
রাজধানীতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে মোটরসাইকেল চোর ও ছিনতাইকারী চক্র। কী দিন, কী রাত- এদের দৌরাত্ম্যে রাস্তা, শপিংমল, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত চত্বর-পার্কিং কোথাও যেন নিরাপদ নয় সাধারণ মানুষের মোটরসাইকেল। গাড়িতে তালা দিয়েও রেহাই মিলছে না, চোখের পলকেই মোটরসাইকেল উধাও করে দিচ্ছে চক্রের সদস্যরা। নগরীর বিভিন্ন রাস্তায় পুলিশের বসানো সিসিটিভি ক্যামেরা থাকায় কৌশল পাল্টে সড়ক ছেড়ে এখন তাদের নজর বাসাবাড়িতে। চুরি-ডাকাতির মোক্ষম সময় হিসেবে এখন তারা বেছে নিচ্ছে ছুটির দিনগুলো। চুরি-ডাকাতিতে বাধা পেলে মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতেও চিন্তা করছে না ভয়ঙ্কর এসব মোটরসাইকেল চোর সিন্ডিকেট। তারা বাসাবাড়িতে চোর হয়ে ঢুকছে। বাধা পেলেই হয়ে যাচ্ছে ডাকাত- এমনকি খুনি।
পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, গত এক মাসে বাসাবাড়িতে হানা দিয়ে দুই ডজনেরও বেশি মোটরসাইকেল চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে রাজধানীতে। বাধা দিতে গেলে দুর্বৃত্তদের হামলায় এক নিরাপত্তাকর্মী নিহত হওয়া ছাড়াও আহত হয়েছেন ১২ জন। এ তথ্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সূত্রের। প্রতিটি ঘটনায় জিডি বা মামলা হয় সংশ্লিষ্ট থানায়। কিন্তু চুরির তুলনায় উদ্ধার সংখ্যা হাতেগোনা এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। জানা গেছে, ঢাকায় মোটরসাইকেল চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটাচ্ছে ১৬টি চক্র। প্রতিটি চক্রেই রয়েছে প্রশিক্ষিত ৫-৮ সদস্য। তাদের বেশিরভাগই কলেজের শিক্ষার্থী। দলের একেক সদস্যের থাকে একেক দায়িত্ব। একজন মোটরসাইকেলের মালিকের চলাচল সম্পর্কে খোঁজ রাখেন। একজন কোথায় সাইকেলটি রাখা হয় তার খোঁজ নেন। তৃতীয়জন চুরি করার পর সাইকেলটি কোন রাস্তা দিয়ে নিরাপদে চালিয়ে নেওয়া যায় তা ঠিক করেন। এভাবে রেকি করার পর দিনক্ষণ ঠিক করে দলের সবাই রাস্তা বা গ্যারেজে রাখা মোটরসাইকেলের তালা ভেঙে চুরি করেন। চোর্যবৃত্তিতে বিশেষ প্রশিক্ষিত এসব সদস্যের আছে গ্যারেজের তালা ভাঙার বিশেষ যন্ত্র। রয়েছে মোটরসাইকেলের বিকল্প চাবি ‘গোল্ডেন কী’ও (এক চাবিতে যে কোনো ধরনের মোটরসাইকেলের লক খোলা যায়)।

রামপুরা মৌলভিরটেক বেসরকারি চাকুরিজিবী কাজী মোয়াজ্জেম হোসেন রুবেল শনিবার (২০ জানুয়ারী) তার বাসার নিচে গেইটের ভিতরে থাকা ১৫০ সিসি হোন্ডা ট্রিগার (ঢাকা মেট্র-ল-১৮-৩৭৭৯) মোটর সাইকেলটি তালা ভেঙ্গে নিয়ে যায় এক অজ্ঞাত চোর। এ ঘটনার পর সাইকেলের মালিক কাজী মোয়াজ্জেম হোসেন রুবেল রামপুরা থানায় ওই দিনই একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-১০০০) করেন। জিডিতে তিনি সকাল ৯ টা ৩০ মিনিটে সাইকেলটি চুরি হয় বলে উল্লেখ করেন। এর পর সিপাহিবাগ কেন্ট রেষ্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষের স্থাপনকৃত থাকা সিসি টিভির ফুটেজে সাইকেল নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটি ধরা পড়ে। সিসি টিভির মনিটরিং রামপুরা থানায় থাকা ফুটেজটিও আনেন সাইকেলের মালিক। এতে দেখা যায় ঘটনার সময় সকাল ৯ টা ৫ মিনিটে কালো জ্যকেট পরা এক যুবক দ্রত মোটর সাইকেলটি নিয়ে খিলগাঁও সিপাহিবাগ নতুন রাস্তা হয়ে নবীনবাগ ছাহেরুনবাগের রাস্তা দিয়ে বনশ্রী ডি ব্লকের দিকে চলে যাচ্ছে। এ সময় যুবকটির মাথায় কোন হেলমেট ছিলোনা। উচ্চতা আনুমানিক সাড়ে ৫ ফুট। ফুটেজ দেখে চুরি হওয়া সাইকেলটি সনাক্ত করেন সাইকেলটির মালিক।

গত শুক্রবার একদিনেই দুটি মোটরসাইকেল চুরির ঘটনা ঘটেছে রাজধানীতে। সেদিন ভোরে মুগদার মানিকনগরের নূর ফাতেমা ভবনে ঢুকে নিরাপত্তাকর্মী মিজান এবং একটি ফ্ল্যাটের গৃহকর্মী আব্দুল গণিকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে ও রড দিয়ে পিটিয়ে একটি মোটরসাইকেল নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। একই দিন দুপুরেই খিলগাঁওয়ের সিপাহিবাগের উত্তর গোড়ান-আদর্শনগরের একটি বাড়ির নিচ থেকে একটি মোটরসাইকেল নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। গত ১০ মার্চ ভোরে উত্তর গোড়ানের ৬৬ নম্বরে যে বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীকে কুপিয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে গিয়েছিল ছিনতাইকারীরা, ওই বাড়ির অদূরেই অবস্থিতি ৩৫০ নম্বর বাড়ি থেকে গত শুক্রবার দুপুরে আরও একটি মোটরসাইকেল চুরি হয়।
ভুক্তভোগী নূরে আলম জানান, ৩৫০ নম্বর বাড়ির নিচে তার ডিসকভার মোটরসাইকেলটি রাখা ছিল। দুপুরে নামাজের সময় লোকজন না থাকার ওই সুযোগে চোরেরা তার বাইকটি নিয়ে যায়। এ ঘটনায় খিলগাঁও থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। কিন্তু গতকাল রাত অবধি উদ্ধার হয়নি নূরে আলমের মোটসাইকেল। গ্রেপ্তার হয়নি চোরচক্রের কেউই।
এর আগে গত ৮ মার্চ গভীর রাতে মিরপুরের উত্তর টোলারবাগে মোটরসাইকেল চুরিতে বাধা দিতে গিয়ে খুন হন নিরাপত্তাকর্মী ওমর ফারুক। চুরি যাওয়া মোটরসাইকেলটি ১০ মার্চ পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা গেলেও পুলিশ খুনিচক্রের কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। ৮ মার্চ রাতেই মিরপুর ২ নম্বর সেকশনের ‘ই’ ব্লকের নোভা রহমান হাউজিং সোসাইটির একটি বাসার নিরাপত্তাকর্মী অপু কুমার সরকার ও আনিসুর রহমানকে কুপিয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। গত ১০ মার্চ ভোরে হাজারীবাগের বউবাজার এলাকায় নিরাপত্তাকর্মী মুরাদ হোসেনকে ছুরিকাঘাত করে মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের চেষ্টা চালানো হয়। তখন ছিনতাইকারী শিবলীকে আটক করে পিটুনি দিয়ে পুলিশে দেয় স্থানীয় লোকজন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম ও জনসংযোগ শাখার উপকমিশনার মাসুদুর রহমান জানান, মোটরসাইকেল চুরির ঘটনাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত চলছে। কিছু কিছু ঘটনায় গ্রেপ্তারও হয়েছে।

জানা গেছে, ঢাকায় মোটরসাইকেল চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় যে ১৩টি চক্র সক্রিয়, এদের মধ্যে অন্যতম মিরপুর সেনপাড়ার শীর্ষ সন্ত্রাসী তাজগিরির ডানহাত হিসেবে খ্যাত ১০ আঙুল কাটা মোশারফ হোসেন। তার রয়েছে ১৩ জন প্রশিক্ষিত শিষ্য। গত বুধবার রাত ১১টার দিকে মিরপুর পপুলার ডায়গনস্টিক সেন্টারের সামনে একটি পালসার মোটরসাইকেলের ঘাড়ের তালা ভাঙার সময় জনতার হাতে আটক হয় তার সহযোগী সাত্তার। খবর পেয়ে পল্লবী থানার এসআই বিল্লাল জনতার হাত থেকে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। কিন্তু অন্য মামলায় তাকে চালান দেওয়া হয়। গতকাল এসআই বিল্লাল আমাদের সময়কে বলেন, যে মোটিরসাইকেলটি চুরির সময় ওই যুবক আটক হন সেই গাড়ির মালিক থানায় অভিযোগ না করায় তাকে অন্য একটি মামলায় চালান দেওয়া হয়।

আরও জানা গেছে, ঢাকায় মোটসাইকেল চোরচক্রের আরেক বড় গুরু শরীয়তপুরের আমির। থাকেন রাজধানীর ধোলাইরপাড় এলাকায়। কোর্ট-কাছারি, গাজীপুর, মাওনায় তার সদস্যরা বেশি সক্রিয়। যাত্রাবাড়ী, শাহবাগ, সূত্রাপুর এলাকায় সক্রিয় যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা ‘শরীয়তপুরইরা মেরাজের’ গ্রুপ। এ ছাড়া গুরু হিসেবে রয়েছেন চিটাগাং রোডের বাসিন্দা খালেক, বাড্ডার রিপন, মেরুল বাড্ডার হুন্ডা রাকিব (গুরুর গাড়ি ও হোন্ডা চোর) ও রিয়াজ, নতুন বাজারের শাহ আলম, খিলগাঁওয়ের মামা খোকন, সিপাহিবাগের মকবুল, সোর্স রহমান, নঈমবাগের নামাপাড়ার গরু শামীম, শনিরআখড়ার জুয়েল, বনশ্রীর বরিশাইল্লা কাজল, মিরপুর ৬ নম্বর সি ব্লকের চোরা জসিম, রামপুরার টিভি সেন্টার এলাকার পিচ্চি আল আমিন, কুঞ্জুবন এলাকার কানা হিমেল ও পাগলা নগরের ফয়সাল, মিরপুর ১২ নম্বরের রনি ওরফে চিকা রইন্না ও স্বপন, খিলগাঁও নবীন বাগের ল্যাংড়া পলাশ, মারুফ, রাসেল, পারভেজ, মিলন (এরা রমনা এলাকার নিয়ন্ত্রক), খিলগাঁও ভূঁইয়াপাড়ার মানিক। মিরপুর, গুদারাঘাট, এক নম্বর, টেকনিক্যাল, বেড়িবাঁধ, ধৌড় এলাকায় একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক গোল্ডেন দুলাল (গাড়ি ও মোটরসাইকেল চোরচক্রের গুরু)।

মোটরসাইকেল চুরি ঠেকাতে কিছু ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে ডিএমপি। যেমনÑ ডিস্ক লক, পার্কিংয়ে সতর্ক হওয়া, বাইকে সিকিউরিটি অ্যালার্ম ব্যবহার, ইমোবিলাইজার সেন্সর সিস্টেম লাগানো, কিল সুইচ-একটা এক্সট্রা লক ব্যবহার ও নিরাপদ পার্কিং নিশ্চিত করা।

সূত্র: আমাদের সময়।