ফাইলফটো: সাত বছরের শিশু শাহ পরাণ।

-সাজ্জাদুর রহমান:

শাহপরানের চিঠি..!
মা-বাবা, কেমন আছো তোমরা ? নিশ্চয় ভাল না। অনেক কেদেছো নিশ্চয়। বাবা তুমি কেদোনা। আমি প্রতি রাতে স্বপ্নে আসবো তোমার কাছে। মাকে বলে দিও আমি আর দুষ্টুমি করবনা। প্রতি রাতেই মায়ের স্বপ্নে আসিব। বাবা তোমার অনেক কষ্ট হচ্ছে বুজি। আমারো অনেক কষ্ট হয়েছে বাবা। ওরা আমাকে দম বন্ধ করে মেরেছে। আমি অনেক চেস্টা করেছি দম নেওয়ার। পারিনি বাবা। ওরা আমার চেয়ে শক্তিশালী ছিল বাবা। ওরা অনেক বড়। আমি ছোট মানুষ তো তাই বাচতে পারিনি বাবা।

বাবা, তুমি খুব আদর করে আমার নাম রেখেছিলে শাহপরান। পীর আউলিয়ার নামে নাম রেখেছিলে তুমি। বালা মসিবত যেন আমাকে স্পর্শ না করে। অনেক ভালবাসতে তুমি আমাকে। কিন্তু ওরা তোমাকে কাদিয়ে তোমার শাহপরান কে মেরে ফেললো বাবা। আচ্ছা বাবা, আমার কি দোষ ছিল বলতে পারো?? এই বয়সে এই সময়ে আমার কি মরে যাওয়ার কথা ছিল? আমার সহপাঠীরা স্কুলের নতুন বইয়ের গন্ধে বিভোর। আমিতো নতুন বইয়ের গন্ধটাও ভাল করে নিতে পারিনাই বাবা। আমারতো আমার বন্ধুদের সাথে এই সময়ে খেলাধুলা করার কথা ছিল বাবা। কিন্তু আমার এমন করুন মৃত্যু কেন মেনে নিতে হলো বাবা। আমিতো তাদের কোনো ক্ষতি করিনাই বাবা। জানো বাবা, ওরা আমাকে মেরে পানিতে ডুবিয়ে রেখেছিল। যাতে তুমি আমাকে শেষ দেখাটাও দেখতে না পারো। কিন্তু বাবা তোমার আর মায়ের মায়ার টানে বেড় হয়ে এসেছি তোমাকে শেষ দেখা দিব বলে। জানি আমাকে নিয়ে তোমার অনেক স্বপ্ন ছিল। আমি দুঃখিত বাবা আমি তোমার স্বপ্ন পুরন করতে পারিনাই। আমারো অনেক স্বপ্ন ছিল বাবা। লেখাপড়া করে একদিন অনেক বড় হব। চাকরী করবো। বিয়ে করবো। সংসার হবে। তোমারা দাদা দাদী হবে আর কত কি। কিন্তু বাবা আমিযে কিছুই করতে পারলাম না। ওরা আমাকে আমার স্বপ্ন, তোমার স্বপ্ন, মায়ের স্বপ্ন কোনোটাই পুরন হতে দেয়নাই। এমন কি আমাকে হত্যা করে তারাও তাদের স্বপ্ন পুরন করতে পারে নাই।

বাবা, আমার মা নিশ্চয় রাতের বেলাতে আমাকে খুব মিস করে। খেতে বসে আমাকে পায়না। কেউ মায়ের কাছে আর আবদার করেনা। এই শীতের রাতে আমি তোমার বুকে মিশে থেকে ঘুমানোর কথা ছিল মা। তুমি তোমার বুকে আগলে রেখে গরম উষ্ণতা দিয়ে আমায় ঘুম পাড়াতে নিশ্চয়। মাগো আমি যে বাচতে চেস্টা করেও পারিনাই মা। ওরা আমাকে অনেক কষ্ট দিয়ে মেরেছে। এই বয়সে এত কষ্ট সহ্য করা খুব কঠিন ছিল মা। ওরা যখন আমার নাকে মুখে গলায় চেপে ধরেছিল তখন আমার পা দুটি অনেক্ষন লাফিয়েছে বাচার জন্য। আমার কলিজাটা ফেটে যাচ্ছিল মা তখন। একসময় থেমে গেছে। আমি পারিনি মা। তোমার ছেলে তোমার বুকে ফিরে আসতে পারেনি। শুনেছি ওরা পুলিশের কাছে ধরা পরেছে। তাদের এই অপরাধের বিচার যেনো হয় সেই দোয়া করিও মা। তবে যে আমি কিছুটা শান্তি পাবো। তোমাকে মা ডেকে বাবাকে বাবা ডেকে আমার যে তৃপ্তি মিটেনাই মা। আমিযে তোমাদেরকে প্রান ভরে মা বাবা ডাকতে পারিনাই।
বাবা, যদি পরজনমে আমাদের দেখা হয় তবে ইচ্ছেমত তোমাকে বাবা ডাকবো। মা কে মা ডাকবো। সেই অপেক্ষায় রইলাম আমি। মা বাবা তোমরা ভাল থেকো, আমার জন্য দোয়া করিও।
বাবাগো বাবা… মাগো মা তোমরা আর কেদোনা। আমি আল্লাহ কে বলব আমি আবার জন্ম নিতে চাই, তোমাদের জন্য। আর দেখতে চাই এই দুই নরপিশাচ দের বিচার কেমন হয়…!
মা, বাবা তোমরা ভাল থেকো।

উল্লেখ্য যে,হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় অপহরণ করে মুক্তিপণ না পেয়ে শাহ পরান নামে সাত বছরের এক শিশুকে হত্যা করা হয়েছে।

এ ঘটনায় একজনকে আটক করেছে পুলিশ।

 মঙ্গলবার (০৯ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় উপজেলার একটি ডুবা থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। শাহ পরান উপজেলার শিবজয়নগর গ্রামের ব্যবসায়ী সাবাশ আলীর ছেলে এবং বটতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্র ছিলো।

মাধবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) চন্দন কুমার চক্রবর্তী জানান, ৬ জানুয়ারি বাড়ির পাশের একটি দোকানের সামন থেকে নিখোঁজ হয় শাহ পরান। পরদিন তার বাবা সাবাশ আলী মাধবপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। এর একদিন পর অপহরণকারীরা তার বাবার মোবাইল ফোনে মুক্তিপণ দাবি করে।

Please follow and like us:
error