সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি | ৩০ আগস্ট ২০১৭, বুধবার

বর্বর। নিষ্ঠুর। অমানবিক। চলন্ত বাসে ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হয়নি দুর্বৃত্তরা। নির্মমভাবে হত্যাও করা হয়েছে। বাসের চালক, সুপারভাইজারসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে এসেছে লোমহর্ষক এ ঘটনার বিস্তারিত। অথচ ধর্ষিতা ওই তরুণীর লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছিল। পরে এ নিয়ে তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে- চার দিন আগে চলন্ত বাসে দল বেঁধে ধর্ষণের পর ওই কলেজ ছাত্রীকে হত্যা করা হয়। টাঙ্গাইলের মধুপুর থানার ওসি শফিকুল ইসলাম জানান, ছোঁয়া পরিবহনের একটি বাসে করে শুক্রবার রাতে বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে নির্যাতন ও হত্যার শিকার হন ওই তরুণী। ওই বাসের চালক, সুপারভাইজারসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনজন ধর্ষণ ও হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।
নিহত রুপা খাতুন সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার আছানবাড়ি গ্রামের জিলহাস প্রামানিকের মেয়ে। সে ঢাকার আইডিয়াল ল’ কলেজে এলএলবি বিষয়ে অধ্যায়নরত ছিল এবং লেখাপড়ার পাশাপাশি ময়মনসিংহ জেলা সদরে অবস্থিত ইউনিলিভার বাংলাদেশের প্রোমশনাল ডিভিশনে কমর্রত ছিলেন।
শুক্রবার রাত ১১টার দিকে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়কের পাশে মধুপুর উপজেলার পঁচিশ মাইল এলাকায় ওই তরুণীর লাশ পাওয়ার পর হত্যার আলামত থাকায় একটি মামলা করে মধুপুর পুলিশ। কিন্তু পরিচয় জানতে না পারায় ময়নাতদন্ত শেষে শনিবার বিকালে টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় কবরস্থানে বেওয়ারিশ হিসেবে তাকে দাফন করা হয়। গণমাধ্যমে লাশ উদ্ধারের খবর পেয়ে সোমবার রাতে মধুপুর থানায় গিয়ে ছবি দেখে রূপাকে শনাক্ত করে তার পরিবার। পরে রূপার বড় ভাই হাফিজুর রহমান ছোঁয়া পরিবহনের শ্রমিকদের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেন। হাফিজুর বলেন, শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় অংশ নিতে শুক্রবার বগুড়ায় যান তার বোন। পরীক্ষা শেষে এক সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে ময়মনসিংহগামী ছোঁয়া পরিবহনের (ঢাকা মেট্রো ব-১৪-৩৯৬৩) বাসে ওঠেন। ওই সহকর্মীর কর্মস্থল ঢাকায় হওয়ায় তিনি টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় নেমে যান। আর ওই বাসেই রূপার ময়মনসিংহে পৌঁছানোর কথা। হাফিজুর আরও বলেন, সঠিক সময়ে রূপা ময়মনসিংহে না পৌঁছানোয় সহকর্মীরা তার মোবাইলে ফোন করেন। এক যুবক ফোনটি ধরে বলেন, ফোনের মালিক ভুল করে সেটি ফেলে গেছেন। এরপর সংযোগ কেটে দেন। এরপর থেকেই ফোনটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। এদিকে শনিবার সকালেও রূপা কর্মস্থলে না যাওয়ায় তার অফিস থেকে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাদের কাছ থেকে রূপার নিখোঁজ থাকার কথা জানতে পেরে আমরা ময়মনসিংহ কোতয়ালি মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করি। পরে মধুপুরে একটি লাশ পাওয়ার খবর মিডিয়ায় দেখে আমরা থানায় যাই।
মধুপুরের ওসি শফিকুল বলেন, রূপার পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর সোমবার রাতেই বাসের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা করেন হাফিজুর। পরে ওই রাতেই অভিযান চালিয়ে ময়মনসিংহ থেকে ছোঁয়া পরিবহনের চালক, সুপারভাইজার, সহকারীসহ পাঁচ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ভিকটিমের মোবাইল ফোনটি পাওয়া যায় তাদের কাছে। ছোঁয়া পরিবহনের বাসটিও জব্দ করা হয়।
ওসি জানান, লাশ উদ্ধারের পর আলামত দেখে সন্দেহ হওয়ার কারণে অপমৃত্যুর মামলা না করে প্রথম দিনই পুলিশের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা করা হয়েছিল। বাসের কর্মচারীদের গ্রেপ্তারের পর তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সেই সন্দেহেরই সত্যতা পান তারা। ওই পাঁচজনের মধ্যে তিনজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হয়েছে। তারা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বলেছে, কালিহাতী থেকে মধুপুর পর্যন্ত রাস্তায় চলন্ত বাসে পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ করা হয় মেয়েটিকে।
মেয়েটি তাদের বলেছিল, বিষয়টি কাউকে বলবো না, সঙ্গে যা টাকা পয়সা আছে, তা নিয়ে যেন তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু ধর্ষণের পর ঘাড় মটকে, মাথা থেঁতলে তাকে হত্যা করে বাসের কর্মচারীরা লাশ রাস্তায় ফেলে চলে যায়। সন্ধ্যা ৬টার দিকে ওসি শফিকুল মোবাইলে জানান, বাসের ৩ হেলপার শামীম, আকরাম ও জাহাঙ্গীরকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করা হচ্ছে। বাকি দুজন চালক ও সুপারভাইজারকে সাথে নিয়ে খুন হওয়া মেয়েটির ব্যবহৃত ওরনা, ব্যানিটিব্যাগ ও পায়ের জুতাসহ অন্যান্য আলামত উদ্ধারে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চলছে। তবে দুজনের নাম জানাননি তিনি। তবে তিনি বলেছেন, অভিযান শেষ হলে সংবাদ সম্মেলন করে ঘটনার বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে।
সন্ধ্যায় টাঙ্গাইল থেকে নিহতের বড় ভাই হাফিজুর রহমান মোবাইলে বলেন, কবর থেকে লাশ উত্তোলন করে পুনরায় ময়নাতদন্ত শেষে আমাদের কাছে হস্তান্তরের জন্য আদালতে আবেদন করেছি। এখনও আবেদনের শুনানি হয়নি। গ্রেপ্তারকৃত ৩ জনের জবানবন্দি রেকর্ড করা হচ্ছে, যে কারণে দেরি হচ্ছে।

Please follow and like us:
error